যুক্তরাষ্ট্রে শাটডাউন আতঙ্ক: কর্মসংস্থান সংকট ও অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৪ বার
যুক্তরাষ্ট্রে শাটডাউন আতঙ্ক: কর্মসংস্থান সংকট ও অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার শঙ্কা

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ‘২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার আবারও বড় ধরনের অচলাবস্থার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। কংগ্রেসে বাজেট অনুমোদন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় শাটডাউনের আশঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে, যা দেশটির শ্রমবাজার, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রায় সাড়ে সাত লাখ সরকারি কর্মীকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হবে, যাদের অনেকে দীর্ঘ সময় বেতন ছাড়াই অপেক্ষায় থাকতে হবে। যদিও শাটডাউন শেষে তাদের বকেয়া বেতন পরিশোধের নজির রয়েছে, তবুও তাৎক্ষণিক সংকটের কারণে তাদের জীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে নিশ্চিতভাবেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক মন্দা সৃষ্টি করতে পারে। সরকারি খাতে কর্মরত বিশাল সংখ্যক মানুষ যদি বেতন না পান, তাহলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোক্তা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। এর ফলে বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিবেচিত সরকারি সেবা বন্ধ হয়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ নাগরিকদের ওপরও।

বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর কংগ্রেস থেকে অনুমোদিত বাজেটই বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মূল অর্থায়ন। অর্থবছর শুরু হয় ১ অক্টোবর, তার আগে যদি বাজেট পাস না হয়, তবে সরকারকে বাধ্য হয়ে শাটডাউনে যেতে হয়। এর মানে হলো, সব অ-অত্যাবশ্যকীয় কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। জরুরি বিভাগগুলো যেমন সীমান্ত নিরাপত্তা, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে হবে বেতন ছাড়াই, তবে যেসব কার্যক্রম অপরিহার্য নয়, সেসব কর্মীকে বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানো হবে।

এই পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েনও চরমে উঠেছে। রিপাবলিকানরা বলছে, সরকার যেন অন্তত মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত চালু থাকে, সে জন্য একটি অস্থায়ী অর্থায়ন ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। তারা একটি স্টপগ্যাপ ফান্ডিং বিল প্রস্তাব করেছে, যা সরকারের ব্যয় চালিয়ে নিতে সাহায্য করবে, কিন্তু এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করছে, রিপাবলিকানরা রাজনৈতিক খেলা খেলছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ আটকাচ্ছে।

হোয়াইট হাউস থেকেও শাটডাউন নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক ব্রিফিংয়ে বলেন, এই পরিস্থিতি ডেমোক্র্যাটদের দোষারোপ করে সমাধান হবে না, বরং দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানো প্রয়োজন। তবে রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা ইচ্ছাকৃতভাবে বাজেট অনুমোদনে বাধা দিচ্ছে, যাতে সরকারের ব্যয় সংকটে পড়ে এবং দায় বর্তায় রিপাবলিকানদের ওপর।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারকার শাটডাউন ২০১৮ সালের তুলনায় আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। তখন আংশিক বাজেট পাসের কারণে কিছু কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এবার প্রায় ৪০ শতাংশ ফেডারেল কর্মী—যার সংখ্যা সাড়ে সাত লাখের মতো—সরাসরি প্রভাবিত হবেন। এরই মধ্যে কিছু সংস্থায় কর্মীদের ছুটিতে পাঠানো শুরু হয়েছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসন আবারও ফেডারেল কর্মীদের স্থায়ী ছাঁটাইয়ের হুমকি দিয়েছে, যা নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

এই অচলাবস্থা শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়বে আমেরিকার সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বেতন না পেলে সরকারি কর্মীরা তাদের দৈনন্দিন ব্যয় কমাতে বাধ্য হবেন। এতে খুচরা বাজার থেকে শুরু করে সেবা খাত পর্যন্ত ধাক্কা খাবে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারেও এর প্রভাব পড়বে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং তার যেকোনো আর্থিক অচলাবস্থা অন্য দেশগুলোর অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শাটডাউনের ফলে অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইউএস সরকার ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে, অননুমোদিত অভিবাসীরা ফেডারেল ভর্তুকিযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। একই সঙ্গে সামাজিক কল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি স্থগিত হয়ে পড়বে, যার ওপর ভরসা করে লাখো মানুষ তাদের জীবনযাপন চালিয়ে যায়।

অন্যদিকে, কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তারা বাজেট পাসের জন্য প্রয়োজনীয় ৬০ ভোট পায়নি। শুক্রবার আরেক দফা ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এ ভোটের ফলাফল নিয়েও ব্যাপক সংশয় রয়েছে। রিপাবলিকানদের একটি অংশ সরকার চালু রাখতে চাইছে অস্থায়ী বরাদ্দের মাধ্যমে, আবার আরেক অংশ স্থায়ী সমাধান ছাড়া কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।

সাধারণ মানুষও এ সংকটের প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছেন। ওয়াশিংটনের এক সরকারি কর্মচারী জানান, “আমাদের পরিবার পুরোপুরি সরকারের বেতনের ওপর নির্ভরশীল। যদি শাটডাউন শুরু হয় এবং বেতন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমরা কীভাবে ভাড়া, বাজার আর অন্যান্য বিল পরিশোধ করব?” এই ধরণের উদ্বেগ এখন লাখো সরকারি কর্মীর পরিবারে ছড়িয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, শাটডাউন দীর্ঘ হলে আমেরিকার জিডিপিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুধুমাত্র সরকারি খাত নয়, বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা শুধু দেশটির প্রশাসনকেই বিপর্যস্ত করছে না, বরং সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাপন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে চলেছে। কংগ্রেস দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে এক ভয়াবহ কর্মসংস্থান সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে আরও ব্যাপক হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত