ইসরায়েলের সঙ্গে ‘যোগসাজশ’, ইরানে ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৯ বার
ইসরায়েলের সঙ্গে ‘যোগসাজশ’, ইরানে ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ইরান আবারও কঠোর বার্তা দিলো দেশটির অভ্যন্তরে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বা ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ নিয়ে। শনিবার সকালে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার অভিযোগে ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির প্রশাসন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহের-এর বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। দণ্ডিতদের নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ এবং স্বীকারোক্তির বিষয়গুলো ইরানি গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।

মেহের জানায়, অভিযুক্তরা ইসরায়েলের হয়ে কাজ করা একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সদস্য ছিলেন। তারা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর চার সদস্যকে হত্যার পাশাপাশি খুজেস্তান প্রদেশের খোররামশহরে একাধিক সহিংস ঘটনায় জড়িত ছিল বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। বিশেষত বোমাবর্ষণসহ নাশকতামূলক কার্যক্রমের অভিযোগে তারা দোষী সাব্যস্ত হন। শনিবার খুজেস্তানের কারাগারে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

শুধু এই ছয়জনই নন, গত কয়েক মাসে ইরান একের পর এক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছে ‘বিদেশি যোগসাজশের’ অভিযোগে। এর আগেই সোমবার দেশটির বিচার বিভাগ বাহমান চৌবি আসল নামের এক ব্যক্তিকে ফাঁসি দেয়। অভিযোগ ছিল, তিনি সরাসরি ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন। বিচার বিভাগের ওয়েবসাইট মিজান অনলাইন এ তথ্য প্রকাশ করে।

ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতা নতুন নয়। এ বছরের জুন মাসে ইসরান ও ইসরায়েল টানা ১২ দিন ধরে এক ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় শত শত মানুষ নিহত হন। ইরানের দাবি, তাদের সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে টার্গেট হন সেই যুদ্ধে। যুদ্ধ শেষে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, দেশটির ভেতরে যারা ইসরায়েলের সঙ্গে যোগসাজশ করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা হবে। সেই ঘোষণার পর থেকে একাধিক ব্যক্তিকে আটক, বিচার ও ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।

এর আগে আগস্টের শুরুতে রুজবেহ ভাদি নামের আরেক ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর করে ইরান সরকার। অভিযোগ ছিল, তিনি একজন পরমাণু বিজ্ঞানীর তথ্য ইসরায়েলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। গত ৯ আগস্ট ইরানের বিচার বিভাগ জানায়, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে আরও ২০ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

এদিকে, ইরানি সংসদ গত জুলাইয়ে নতুন একটি আইন পাস করে। আইনটিতে বলা হয়, যে কোনো নাগরিক যদি ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে—সেটি সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তা যাই হোক না কেন—তাহলে তা ‘পৃথিবীতে দুর্নীতি ছড়ানো’র শামিল এবং এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। শুধু ইসরায়েল নয়, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের শত্রু বিবেচিত অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখাকে আইনত গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে।

আইনে আরও বলা হয়েছে, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য পাচার বা গুপ্তচরবৃত্তি করা হলে শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। বিশেষভাবে ইসরায়েলের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দখলদার রাষ্ট্রটিকে সহায়তা করা বা তার হয়ে কাজ করা মানেই দেশদ্রোহিতা এবং অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা ভোগ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

শুধু তাই নয়, নতুন আইন অনুযায়ী অননুমোদিত ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার ও সরঞ্জাম আমদানিও এখন অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। যেমন, স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবহারের সরঞ্জাম কিনে রাখা বা বিক্রি করা হলে অভিযুক্তকে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে। আর যারা এসব সরঞ্জামের ১০টির বেশি উৎপাদন বা আমদানি করবে, তাদের জন্য শাস্তি আরও কঠোর—৫ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইরানের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। নরওয়ে ভিত্তিক সংস্থা আইএইচআর জানায়, শুধু ২০২৩ সালের প্রথম ২৬ দিনেই ৫৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ইরান সরকার। সংস্থাটির দাবি, এসব মৃত্যুদণ্ড কেবল আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্যে নয়, বরং ভিন্নমত দমন ও আতঙ্ক সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

হিজাব বিতর্ক ঘিরে সারা দেশে যেসব সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল, তার পর থেকেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার বেড়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ। আইএইচআর-এর তথ্যমতে, হিজাব ইস্যুতে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১০৭ জন এখনো মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত চার জনকে এ মাসেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কনিষ্ঠতম একজনের বয়স মাত্র ১৮ বছর।

সংস্থাটির পরিচালক মাহমুদ আমিরি মোঘাদ্দাম অভিযোগ করেছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক। তার ভাষায়, “ইরান সরকার এই মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে জনগণের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দমননীতিরই অংশ।”

ইরান অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির সরকারের দাবি, যারা মৃত্যুদণ্ড পাচ্ছে, তারা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত। ইসরায়েল এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা ইরানের জন্য নিরাপত্তাজনিত সবচেয়ে বড় হুমকি। আর সে কারণে আইন অনুযায়ী তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা হচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের এই নীতির সমালোচনা থামছে না। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একাধিকবার ইরানকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক ভিন্নমত পোষণ করে বা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেয়, তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে বিভিন্ন সংস্থা।

তবুও ইরান নিজেদের অবস্থানে অটল রয়েছে। দেশটির শীর্ষ নেতাদের দাবি, ইসরায়েল ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে তৎপর, আর সেই ষড়যন্ত্র ঠেকাতেই কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হচ্ছে।

খুব স্বল্প সময়ে ধারাবাহিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ইরান যে বার্তা দিতে চাইছে তা স্পষ্ট—রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। যদিও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে ইরানের জনগণের ভেতরে আরও ক্ষোভ ও প্রতিরোধ তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ইরান–ইসরায়েল সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে তীব্র প্রতিযোগিতা আগামী দিনে আরও জটিল হয়ে উঠবে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের ভেতরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত