সর্বশেষ :
মালদ্বীপে রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় নতুন উদ্যোগ, স্থানীয় মুদ্রায় পাঠানোর সুযোগ নিয়ে বৈঠক তারেক রহমানের সঙ্গে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের আলোচনা ‘এটা ঘটবেই’: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শক পাঠানো হবে, জানাল আইএইএ ২৪ কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েও হামের টিকা পায়নি অনেক শিশু, উদ্বেগ বাড়ছে স্বাস্থ্যখাতে টাঙ্গাইলে ভাইরাল কৃষক কবির হোসেনের দাফন সম্পন্ন, শেষ বিদায়ে শোকে ভারী জনপদ সঠিক নীতিসহায়তা পেলে রফতানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর সম্ভাবনা: বাণিজ্যমন্ত্রী মশার কয়েলের আগুনে পুড়ল গোয়ালঘর, প্রাণ গেল তিন গরুর, দগ্ধ কৃষক গোপালগঞ্জে মহাসড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল যুবকের “রিলিফ নয়, স্থায়ী সমাধান চাই” — তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ

রিজার্ভ বেড়ে ৩১.৬৮ বিলিয়ন ডলার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৩ বার
নভেম্বরের ১৬ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও দেখা দিয়েছে আশাব্যঞ্জক উত্থান। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে। গত কয়েক মাসের ধারাবাহিক ওঠানামার পর এই বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার এক ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।

এই পার্থক্যটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, আইএমএফ মানদণ্ড অনুযায়ী, রপ্তানি ঋণ, আমদানি বিল পরিশোধ এবং স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় বাদ দিয়ে প্রকৃত রিজার্ভ নির্ধারণ করা হয়। ফলে সংখ্যাটি তুলনামূলক কম দেখালেও প্রকৃত অর্থে দেশের রিজার্ভের অবস্থান এখনো স্থিতিশীল।

বাংলাদেশ ব্যাংক সোমবার (৬ অক্টোবর) এ তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে আরও বলা হয়, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাই থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই সময়ের মধ্যে দেশে পাঠিয়েছেন ৮ হাজার ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৯৬৭ মিলিয়ন ডলার।

শুধু অক্টোবর মাসের প্রথম পাঁচ দিনেই দেশে এসেছে ৪২২ মিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়া এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনা সুবিধা অব্যাহত থাকায় রেমিট্যান্স প্রবাহে এই বৃদ্ধি এসেছে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, দেশ থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের প্রস্থান ও আমদানি খরচ বৃদ্ধির কারণে রিজার্ভে চাপও বাড়তে পারে।

এমন এক সময়েই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল (পি অ্যান্ড জি)-এর ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা। ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা এই প্রতিষ্ঠানটি তিন দশক পর হঠাৎই দেশের বাজার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বহুমুখী আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তানে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করা হচ্ছে, যা তাদের বৈশ্বিক পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ। পি অ্যান্ড জি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭,০০০ কর্মী ছাঁটাই করছে, যা তাদের মোট কর্মীর প্রায় ৬.৪ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য—অপারেশনাল ব্যয় সংকোচন এবং ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক বিনিয়োগের জন্য তহবিল সঞ্চয়।

১৮৩৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনসিনাতিতে প্রতিষ্ঠিত পি অ্যান্ড জি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা পণ্য প্রস্তুতকারক। বাংলাদেশে তারা পরিচিত ছিল জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর মাধ্যমে—জিলেট, ওরাল-বি, প্যাম্পারস, হুইসপার, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, প্যান্টিন, ওলে, এরিয়াল, টাইড, মি. ক্লিন এবং ভিক্স।

বাংলাদেশের বাজারে এদের পণ্য পরিবেশনের দায়িত্বে ছিল এমজিএইচ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ডস লিমিটেড (আইবিএল)। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটি আইবিএল-এর সঙ্গে তাদের পরিবেশক চুক্তি বাতিল করেছে এবং চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। আইবিএল-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কয়েক মাস আগেই প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। আমরা এখন আগের মজুদ পণ্য বিক্রিই চালিয়ে যাচ্ছি।”

এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ইতিমধ্যেই বাজারে পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর বেশ কিছু সুপারশপ ও বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ঘুরে দেখা গেছে, জিলেট রেজর, হেড অ্যান্ড শোল্ডার শ্যাম্পু ও প্যাম্পারস ডায়াপারের মতো জনপ্রিয় পণ্যের মজুদ শেষ হয়ে আসছে। একাধিক খুচরা বিক্রেতা জানিয়েছেন, তারা নতুন করে সরবরাহ পাচ্ছেন না, কারণ পরিবেশক সংস্থা আর কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য পাচ্ছে না। ফলে ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে—বিশেষ করে ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের ক্ষেত্রে যেখানে পি অ্যান্ড জি-র প্রাধান্য ছিল স্পষ্ট।

বাংলাদেশে পি অ্যান্ড জি শুধু আমদানি নির্ভর ব্যবসাই করেনি, বরং স্থানীয় উৎপাদনেও বিনিয়োগ করেছিল। ২০২১ সালে প্রাণ গ্রুপের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে হবিগঞ্জের অলিপুরে একটি কারখানা স্থাপন করে তারা। এখানে জিলেট ব্র্যান্ডের রেজর উৎপাদন হতো। প্রাণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান অ্যাডভান্সড পার্সোনাল কেয়ার লিমিটেডের (এপিসিএল) সঙ্গে যৌথভাবে স্থাপিত এই কারখানায় দুই পক্ষ মিলে প্রায় ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

কিন্তু কারখানা স্থাপনের মাত্র চার বছর পরই উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াস মৃধা বলেন, “আমরা প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে কাজ করতাম। জানুয়ারি থেকে তারা সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। আমাদের কারখানা প্রস্তুত আছে, যখন তারা অনুমতি দেবে, তখন আমরা আবার উৎপাদন শুরু করতে পারব।”

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পি অ্যান্ড জি-এর মতো একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের প্রস্থান বাংলাদেশের বাজারে একধরনের ‘সতর্ক সংকেত’। যদিও কোম্পানির পক্ষ থেকে এটি “বিশ্বব্যাপী পুনর্গঠনের অংশ” বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তবে স্থানীয় বাজারে এমন সিদ্ধান্ত বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্যের বাজারে মুদ্রাস্ফীতি, লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি অনেক বিদেশি কোম্পানির জন্য চাপ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা এ ধরনের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য যে সুবিধা দেওয়া হয়, তা আরও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা দেশে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা বজায় রাখতে পারে।”

রয়টার্সের তথ্যমতে, পি অ্যান্ড জি ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিশ্বব্যাপী ৮৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিক্রি করেছে। কিন্তু এর অর্গানিক বিক্রয় প্রবৃদ্ধি সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও ইউরোপে বিক্রয় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ এবং উদীয়মান বাজারগুলোতে মাত্র ১ শতাংশ। এর আগেও তারা আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়া থেকে সম্পূর্ণ কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছিল।

এমন সময়ে যখন বৈদেশিক রিজার্ভে স্বস্তির বার্তা এসেছে, ঠিক তখনই পি অ্যান্ড জি-এর মতো কোম্পানির প্রস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একধরনের মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং মুদ্রা বিনিময় বাজারের স্থিতি ইতিবাচক খবর দিচ্ছে; অন্যদিকে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেলে তা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, “রিজার্ভের সাম্প্রতিক বৃদ্ধি আশার কথা। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নির্ভয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। বাজারে নীতিনির্ধারক অনিশ্চয়তা বা মুদ্রা বিনিময়ের অস্থিতিশীলতা বিদেশি কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।”

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক দ্বিমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রবাসী আয়, রপ্তানি ও রিজার্ভ বৃদ্ধির ইতিবাচক স্রোত; অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারের মন্দা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের উদ্বেগ।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ সময়টি বাংলাদেশের জন্য এক বড় পরীক্ষা—কীভাবে দেশটি একদিকে বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির ধারা বজায় রেখে, অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, সেটাই হবে আগামী মাসগুলোতে অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত