বদির বিরুদ্ধে আরও ১০ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৩ বার

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় আরও ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই মামলার অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ দেখা দিয়েছে বিচারপ্রার্থী ও রাজনৈতিক মহলে।

বুধবার আদালতে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় আবদুর রহমান বদি কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে ভার্চুয়ালি আদালত কার্যক্রমে অংশ নেন। শুনানিতে দুদকের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রনি।

অ্যাডভোকেট রনি বলেন, “অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা আশা করছি, অচিরেই অবশিষ্ট সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে এগোনো সম্ভব হবে।”

এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন ইসলামি ব্যাংক লিমিটেডের টেকনাফ শাখার তৎকালীন সিনিয়র অফিসার রেজাউল করিম ও সহকারী অফিসার তানভীর আলম। তাঁরা ব্যাংক লেনদেন, সম্পদের উৎস ও অর্থের গতি নিয়ে আদালতে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, সাক্ষীদের জবানবন্দিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে, যা মামলার বিচারকার্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় স্পেশাল দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. ইসমাইল হোসেন অভিযোগ গঠন করে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দেন। অভিযোগ গঠনের পর থেকে মামলাটি নানা কারণে বিলম্বিত হলেও সম্প্রতি সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।

দুদক ২০১৮ সালে আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, তিনি তাঁর ঘোষিত আয়ের উৎসের বাইরে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন, যার সুনির্দিষ্ট হিসাব তিনি দিতে ব্যর্থ হন। তদন্তে দেখা যায়, তাঁর নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে জমি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্যবসায়িক বিনিয়োগসহ একাধিক সম্পদ রয়েছে, যার উৎস সম্পর্কে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।

আবদুর রহমান বদি বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমার সব সম্পদ বৈধ উপায়ে অর্জিত। আমি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছি, জনগণই আমার প্রকৃত সাক্ষী।”

আবদুর রহমান বদি দীর্ঘ সময় ধরে কক্সবাজারের রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত এক নাম। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একাধিকবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় সংশ্লিষ্টতা, প্রভাব বিস্তার ও সম্পদ লুকানোর অভিযোগ বহুবার উঠেছে।

দুদকের মামলাটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বড় একটি মোড় এনে দেয়। এক সময় মন্ত্রিত্বের আলোচনায় থাকলেও, এসব অভিযোগের পর তিনি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ড বহাল রাখলে তিনি আপিল করেন। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে তিনি জামিনে মুক্ত থাকলেও, এখন আবার মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্বে কারাগার থেকে ভার্চুয়ালি অংশ নিচ্ছেন।

না গেছে, ইতিমধ্যে যে ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তাঁদের বক্তব্য মামলার প্রমাণ উপস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে ব্যাংক কর্মকর্তা, ভূমি রেজিস্ট্রার এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য মামলার আর্থিক বিশ্লেষণ ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

আইনজীবীরা বলছেন, এই মামলায় প্রমাণের ভার বেশ জটিল। কারণ সম্পদের উৎস ও ব্যবহারের তথ্য প্রমাণ করা যেমন কঠিন, তেমনি দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক তথ্য এখন আর সহজলভ্য নয়। তবে দুদকের পক্ষ দাবি করছে, তাদের হাতে থাকা দলিল ও আর্থিক নথি

বদির মামলাটি কেরানীগঞ্জ কারাগার সংলগ্ন বিশেষ আদালতে চলছে। আদালত ইতিমধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আরও কয়েকটি তারিখ নির্ধারণ করেছে। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।

আইনজীবীরা বলছেন, দুদকের এ মামলাটি শুধু একজন সাবেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, বরং এটি দুর্নীতি দমনে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি পরীক্ষা। কারণ এটি প্রমাণ করবে, উচ্চপদস্থ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধেও আইন সমানভাবে প্রযোজ্য কি না।

বাংলাদেশে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা নতুন নয়। তবে এসব মামলার নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া প্রায়ই দীর্ঘ হয় এবং শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই তা জনআস্থা হারায়। কিন্তু আবদুর রহমান বদির মামলাটি ভিন্ন আলোচনায় এসেছে, কারণ এটি দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টার বাস্তব রূপ দেখতে চায় এমন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

দুদকের আইনজীবী রেজাউল করিম রনি বলেন, “আমরা চাই মামলাটি দ্রুত শেষ হোক এবং আদালত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুক। কোনো ব্যক্তি, তিনি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে নন।”

বদির মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় এখন সবার নজর পরবর্তী পর্যায়ে। আদালতের রায় কী হবে, তা সময়ই বলবে, তবে স্পষ্ট যে, এই মামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত