নোবেল শান্তি পুরস্কার ট্রাম্পকে উৎসর্গ করলেন মারিয়া কোরিনা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪১ বার
নোবেল শান্তি পুরস্কার ট্রাম্পকে উৎসর্গ করলেন মারিয়া কোরিনা

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫।  একটি বাংলাদেশ ডেস্ক,  একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ভেনিজুয়েলার আপোষহীন বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোড়ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। নিজের পুরস্কারটি তিনি উৎসর্গ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে—যাকে তিনি ভেনিজুয়েলার স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সহযোগী ও প্রেরণার উৎস বলে বর্ণনা করেছেন।

নরওয়ের রাজধানী ওসলোতে শুক্রবার (১০ অক্টোবর) নোবেল কমিটি ঘোষণা করে, “ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এবং নিপীড়নের মুখে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়ার জন্য” মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

মারিয়া কোরিনা নোবেল জয়ের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “এই পুরস্কার ভেনিজুয়েলার প্রতিটি নাগরিকের সংগ্রামের প্রতীক। এটি আমাদের স্বাধীনতার যাত্রায় আরও শক্তি ও অনুপ্রেরণা যোগাবে। আমি এই স্বীকৃতি উৎসর্গ করছি তাদের জন্য, যারা অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আজও লড়ছেন। সেই সঙ্গে আমি এটি উৎসর্গ করছি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে—যিনি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সংগ্রামে আমাদের পাশে থেকেছেন, আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন।”

তার পোস্টে আরও দেখা যায়, তিনি ভেনিজুয়েলাবাসীর উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছেন—“আমরা এখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। একসঙ্গে থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়।”

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সংবাদমাধ্যমকে জানান, মারিয়া কোরিনা তাঁকে ফোনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, “আজ সকালে নোবেল বিজয়ী মারিয়া কোরিনা আমাকে ফোন করলেন। তিনি জানালেন, এই পুরস্কারটি তিনি আমার সম্মানে গ্রহণ করেছেন। আমি তাঁকে বলেছি—এটি আপনারই প্রাপ্য, কারণ আপনি অসাধারণ কাজ করেছেন। তিনি একজন শক্তিশালী ও সাহসী নারী।”

তবে ট্রাম্প সেই সুযোগে নিজের পুরস্কার প্রাপ্তির সম্ভাবনা নিয়েও মন্তব্য করতে ভোলেননি। তিনি বলেন, “আমি অনেক যুদ্ধ থামিয়েছি, শান্তিচুক্তি করেছি, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন দিগন্ত খুলেছি—আমি বিশ্বাস করি, নোবেল কমিটি জানে, আমি শান্তির জন্য কতটা কাজ করেছি। তবে আমি নোবেল না পেলেও সমস্যা নেই, কারণ ইতিহাস জানবে আমরা কী করেছি।”

ওভাল অফিসে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্পের কণ্ঠে ছিল গর্ব ও খানিকটা ব্যঙ্গের সুর। তিনি বলেন, “তিনি (মারিয়া কোরিনা) খুব ভালো করেছেন। আমাকে না বলেও বলেছেন, আপনি এটি প্রাপ্য ছিলেন। আমি তাঁকে বলিনি যে তাহলে এটি আমাকে দিন, কিন্তু আমি জানি, এই সম্মানের অংশীদার আমি।”

তবে মারিয়া কোরিনার এমন সিদ্ধান্তের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়ার ঝড় উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, একজন নোবেল বিজয়ীর পক্ষে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে পুরস্কার উৎসর্গ করা একটি অস্বাভাবিক পদক্ষেপ। বিশেষত এমন একজন ব্যক্তিকে, যিনি নিজেও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছেন, তাঁর কাছে নোবেল উৎসর্গ করা এক অভূতপূর্ব ঘটনা।

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউজ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, “নোবেল শান্তি পুরস্কার এখন আর প্রকৃত শান্তির প্রতীক নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বন্ধে, মানবজীবন রক্ষায় এবং শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। অথচ তাঁকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।”

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একজন মানবিক নেতা, যিনি নিজের ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ়তায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ইতিহাস একদিন প্রমাণ করবে, তিনিই ছিলেন প্রকৃত শান্তির দূত।”

ভেনিজুয়েলায় মারিয়া কোরিনার এই নোবেল জয়কে স্বাগত জানিয়েছে তার দলের সমর্থকরা। রাজধানী কারাকাসের রাস্তায় শত শত মানুষ তাঁর ছবিসহ মিছিল করেছে। তারা বলেছে, “এটি শুধু মারিয়ার জয় নয়, এটি আমাদের স্বাধীনতার জয়।” অনেকের হাতে ছিল ট্রাম্পের ছবিও, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে নোবেল বিজয়ীর বক্তব্যের প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে দেশটির ক্ষমতাসীন সরকার, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রশাসন, নোবেল পুরস্কার প্রদানের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে। সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, “নোবেল কমিটি ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে। তারা এমন একজন নেত্রীকে পুরস্কৃত করেছে, যিনি বিদেশি শক্তির হয়ে কাজ করছেন।”

মারিয়া কোরিনা মাচাদো দীর্ঘদিন ধরে ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তিনি একাধিকবার কারাবন্দী হয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন, এমনকি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু কখনো থেমে যাননি। তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিরোধী জোট, যারা মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে।

নোবেল জয় তাঁর জন্য যেমন ব্যক্তিগত স্বীকৃতি, তেমনি এটি ভেনিজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের জন্য এক নতুন অনুপ্রেরণা। কিন্তু তাঁর পুরস্কার ট্রাম্পকে উৎসর্গ করার ঘোষণা আবারও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে এই সম্মানজনক পুরস্কারকে।

বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মারিয়া কোরিনার এই সিদ্ধান্ত কেবল আবেগের প্রকাশ নয়, বরং এটি এক কৌশলগত পদক্ষেপও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে তিনি হয়তো ভেনিজুয়েলার মুক্তি আন্দোলনের জন্য আরও আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের পথ তৈরি করতে চাইছেন।

যেভাবেই দেখা হোক না কেন, মারিয়া কোরিনা মাচাদোর এই নোবেল জয় এবং ট্রাম্পকে উৎসর্গ করার ঘোষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে শান্তি পুরস্কারের প্রকৃত অর্থ নিয়ে। শান্তির নামে রাজনৈতিক প্রভাব, নাকি রাজনৈতিক প্রেরণায় শান্তির স্বীকৃতি—এখন সেই বিতর্কই ঘুরছে বিশ্বজুড়ে।

তবে মারিয়া কোরিনা নিজের অবস্থানে অটল। ওসলো থেকে কারাকাসে ফেরার সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমি নোবেল পুরস্কার জয়ী নই, আমি একজন স্বাধীনতার যোদ্ধা। এই পুরস্কার আমি আমার দেশ এবং সেইসব মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি, যারা বিশ্বাস করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র কখনো মরে না।”

আর তাই হয়তো বলা যায়—এই নোবেল শুধু শান্তির প্রতীক নয়, এটি এক নারীর সংগ্রামের ইতিহাস, এক জাতির স্বাধীনতার আর্তি, এবং এক অপ্রত্যাশিত উৎসর্গের গল্প, যা দীর্ঘদিন মনে রাখবে বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত