প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজার বিধ্বস্ত আকাশের নিচে আবারও জীবন ফিরে আসছে ধীরে ধীরে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর, একসময় ধোঁয়া ও ধ্বংসের নগরীতে পরিণত হওয়া গাজা সিটি এখন ভরপুর মানুষে। শনিবার (১১ অক্টোবর) ফিলিস্তিনের সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে অন্তত পাঁচ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি ফিরে এসেছেন তাদের পুরোনো এলাকায়। এটি একদিকে এক মহা মানবিক প্রত্যাবর্তন, অন্যদিকে ধ্বংসের ভেতরেও জীবনের অনন্ত প্রত্যয়ের প্রতিচ্ছবি।
গাজার সিভিল ডিফেন্স মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল জানান, “গতকাল থেকে এখন পর্যন্ত আমরা দেখেছি পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ গাজা সিটিতে ফিরে এসেছেন। অনেকেই তাদের ভাঙা বাড়ির ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন, কিন্তু সেই কান্নায়ও এক অদ্ভুত শক্তি আছে—ফিরে আসার, টিকে থাকার।”
একসময় যে রাস্তাগুলোতে ট্যাংক চলত, এখন সেখানে হাঁটছেন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মানুষ। কেউ হাতে শিশুর খেলনা, কেউ একটি থালা বা বালিশ—যতটুকু নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন, ততটুকুই সঙ্গে করে ফিরছেন। রাস্তার ধারে ছড়িয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা কংক্রিট, পোড়া গাড়ি; অথচ তারই ফাঁকে ফাঁকে উঠছে নতুন জীবনের প্রথম আলো।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে এক জটিল কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পর। প্রায় দুই বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসের শেষদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আরব ও মুসলিম নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই আলোচনার সূত্র ধরেই ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা তৈরি হয়। এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে এই পরিকল্পনা প্রকাশ করেন ট্রাম্প।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় মিশরের শারম আল–শেখ শহরে শুরু হয় হামাস ও ইসরাইলের প্রতিনিধিদের পরোক্ষ আলোচনা। তিন দিনব্যাপী এই বৈঠকের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে তৈরি হয় যুদ্ধবিরতির রূপরেখা। অবশেষে ৮ অক্টোবর দিবাগত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবের প্রথম ধাপ মানতে সম্মত হয় দুই পক্ষ। ১০ অক্টোবর ইসরাইলি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অনুমোদন করে এবং একই দিন থেকে গাজা উপত্যকায় সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়।
এই ঘোষণার পরপরই গাজা সিটিতে মানুষের স্রোত। অনেকে রাস্তায় শিবির থেকে ফিরছেন, কেউ আবার মিশরের সীমান্ত এলাকা থেকে দীর্ঘ যাত্রা শেষে নিজেদের ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় ফিরে যাচ্ছেন। অনেকের চোখে স্বস্তির অশ্রু, অনেকের মুখে অনিশ্চয়তার ছায়া—কারণ, ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু ঘরগুলো আর আগের মতো নেই। যেসব বাড়ি একসময় পরিবারে হাসি-আনন্দে মুখর ছিল, এখন সেখানে শুধু ভাঙা দেয়াল, পুড়ে যাওয়া দরজার কাঠ, আর ছড়িয়ে থাকা ইটপাথর।
একজন প্রত্যাবর্তনকারী, ৩৫ বছর বয়সী রিমা হামদানি, স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, “আমি জানি, এই শহরে আর কিছু নেই, কিন্তু এটিই আমার শহর। আমার মা-বাবার কবর এখানেই, আমার সন্তানদের প্রথম হাঁটা এখানেই। তাই ধ্বংস হলেও আমি ফিরে এসেছি।” রিমার মতো হাজারো নারী-পুরুষ আজ গাজা সিটির রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে গাজা উপত্যকায় প্রায় এক লাখের বেশি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎকেন্দ্র—সবই ক্ষতিগ্রস্ত। তবুও মানুষ ফিরছে, কারণ তাদের কোথাও যাওয়ার নেই। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন গাজায় মানবিক সহায়তা জোরদার করছে, কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা এখনো অপ্রতুল।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “যুদ্ধবিরতি এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। শান্তি টেকসই করতে হলে উভয় পক্ষকে আস্থা গড়ে তুলতে হবে, আর মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে দিতে হবে। গাজার মানুষ এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে।”
অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, তারা ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করছে এবং সীমান্তে নজরদারি জোরদার রাখছে যেন হামাস আবারও কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে না পারে। হামাসের রাজনৈতিক শাখা বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলবে, তবে গাজার ওপর থেকে ইসরাইলি অবরোধ পুরোপুরি না উঠলে শান্তি স্থায়ী হবে না।
এই যুদ্ধবিরতি ও প্রত্যাবর্তনের মাঝেই গাজা সিটির জীবন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। শিশুরা রাস্তায় খেলছে, কেউ কেউ ভাঙা স্কুলের দেয়ালে চক দিয়ে লিখছে—“আমরা বাঁচব, আমরা ফিরে এসেছি।” এটি যেন ধ্বংসস্তূপের ভেতরেও জীবনের ঘোষণা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও গাজার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি। কারণ, পুনর্গঠন শুরু হলেও খাদ্য, পানি, ওষুধের সংকট ভয়াবহ। হাসপাতালগুলোতে এখনো আহতদের ভিড়, চিকিৎসকরা কাজ করছেন সীমিত সরঞ্জামে।
বিশ্বজুড়ে শান্তিকামী মানুষ গাজার এই প্রত্যাবর্তনকে মানবিক সাহসের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। কেউ বলছেন, এটি প্রমাণ করে মানুষ কখনো হার মানে না—যুদ্ধ, ক্ষুধা, ধ্বংস—কোনো কিছুই তাকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
গাজা সিটির আকাশে এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে যুদ্ধের ধোঁয়ার গন্ধ, কিন্তু সেই ধোঁয়ার ভেতর দিয়েও সূর্য ওঠে—নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। গাজার মানুষরা সেই ভোরের দিকেই এগোচ্ছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে গড়ে তুলছে তাদের প্রিয় শহর, তাদের জীবন।
এ যেন ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়—যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি ফিরে আসা মানুষ একটিই কথা বলছে—“আমরা বাঁচতে চাই, শান্তিতে থাকতে চাই।”
একটি বাংলাদেশ অনলাইনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সামরিক বিরতি নয়; এটি এক মানবিক জাগরণের সূচনা। কারণ, গাজার এই প্রত্যাবর্তন কেবল ঘরে ফেরার গল্প নয়—এটি এক জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, এক অবিনাশী আশা।