সর্বশেষ :
মালদ্বীপে রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় নতুন উদ্যোগ, স্থানীয় মুদ্রায় পাঠানোর সুযোগ নিয়ে বৈঠক তারেক রহমানের সঙ্গে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের আলোচনা ‘এটা ঘটবেই’: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শক পাঠানো হবে, জানাল আইএইএ ২৪ কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েও হামের টিকা পায়নি অনেক শিশু, উদ্বেগ বাড়ছে স্বাস্থ্যখাতে টাঙ্গাইলে ভাইরাল কৃষক কবির হোসেনের দাফন সম্পন্ন, শেষ বিদায়ে শোকে ভারী জনপদ সঠিক নীতিসহায়তা পেলে রফতানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর সম্ভাবনা: বাণিজ্যমন্ত্রী মশার কয়েলের আগুনে পুড়ল গোয়ালঘর, প্রাণ গেল তিন গরুর, দগ্ধ কৃষক গোপালগঞ্জে মহাসড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল যুবকের “রিলিফ নয়, স্থায়ী সমাধান চাই” — তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ

দাম বেড়েই চলেছে সোনা, ভরি প্রতি রেকর্ড ২ লাখ ৯ হাজার টাকা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৪ বার
বাংলাদেশ সোনার দাম আজ

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড স্পর্শ করেছে। বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান মূল্যের প্রভাব, মুদ্রা বিনিময় হার এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে এক অভূতপূর্ব মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সোমবার (১৩ অক্টোবর) পর্যন্ত বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নির্ধারিত দামে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৯ হাজার ১০১ টাকায়—যা এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

গত ৮ অক্টোবর বাজুস স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি ৬ হাজার ৯০৬ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর ফলে সেদিন থেকেই কার্যকর হয় নতুন এই মূল্য। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে খাঁটি বা তেজাবি স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারেও দামের সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি শুধুমাত্র বাজার বাস্তবতা প্রতিফলিত করছে বলে দাবি করছে বাজুস।

বাজুসের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য বাড়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ১০১ টাকা, ২১ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৮ টাকা। অন্যদিকে, সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ভরিপ্রতি ১ লাখ ৪২ হাজার ৩০১ টাকা।

বাজুস আরও জানিয়েছে, এই দামের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং বাজুসের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ৬ শতাংশ যুক্ত করতে হবে। তবে গহনার ডিজাইন, মান ও কারুকার্যের ওপর ভিত্তি করে মজুরির তারতম্য হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে গত ৭ অক্টোবরও স্বর্ণের দাম বাড়িয়েছিল বাজুস। সেদিন ভরিপ্রতি ১ হাজার ৪৬৯ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম হয়েছিল ২ লাখ ২ হাজার ১৯৫ টাকা। ওই সময় সেটিই ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আরও এক দফা বৃদ্ধি দেশের স্বর্ণবাজারে এক নতুন নজির স্থাপন করল।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনও স্থানীয় বাজারে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডলারের সংকট এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে স্বর্ণের দাম আরও চাপে রয়েছে।

একইসঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতাও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিয়ের মৌসুম ও উৎসবকে ঘিরে ক্রেতাদের আগ্রহ যেমন বাড়ছে, তেমনি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা থাকায় স্বর্ণের বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হচ্ছেন নতুন করে দাম সমন্বয় করতে।

এ নিয়ে চলতি বছর ২০২৫ সালে ইতিমধ্যে ৬৩ বার দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছে বাজুস। এর মধ্যে ৪৫ বার দাম বাড়ানো হয়েছে, আর কমানো হয়েছে মাত্র ১৮ বার। গত বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে মোট ৬২ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৫ বার দাম বেড়েছিল এবং ২৭ বার কমানো হয়েছিল। এ পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে ঊর্ধ্বগতি এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বর্ণব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়ছে, অন্যদিকে টাকার মান কমছে। ফলে স্বর্ণের আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। এক ভরি স্বর্ণ দেশে আনতে এখন যে ব্যয় হয়, তা কয়েক মাস আগের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে স্থানীয় বাজারে ক্রেতার আগ্রহ। ফলে সব মিলিয়ে দাম আরও উপরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, বিশেষ করে যারা বিয়ে বা উপহার হিসেবে স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। আবার অনেকে বলছেন, দামের এই ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণকে সবসময়ই নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

স্বর্ণের এই ক্রমবর্ধমান মূল্য নিয়ে অর্থনীতিবিদরাও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তারা বলছেন, দেশে মুদ্রাস্ফীতি ও আমদানি ব্যয়ের চাপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে স্বর্ণের দামের সঙ্গে সঙ্গে অন্য পণ্যের দামও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিলাসপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি। একইসঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে স্বর্ণের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৬৮০ ডলারের কাছাকাছি, যা ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ মূল্য। শুধু গত তিন মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশেই স্থানীয়ভাবে দাম পুনর্নির্ধারণ করতে হচ্ছে ঘন ঘন।

বাজুসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই প্রতিবার দাম নির্ধারণ করি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম বাড়লে আমাদেরও সমন্বয় করতে হয়। এখানে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছামতো দাম বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ নেই। তবে আমদানি ব্যয়, ভ্যাট ও মজুরি যুক্ত করলে দাম স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বাড়ে।”

তবে দেশের অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই ধরণের ঘন ঘন মূল্যবৃদ্ধি স্বর্ণবাজারে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানের অভাব তৈরি করছে। সাধারণ ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। সরকার ও বাজুসের মধ্যে সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করা গেলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন তারা।

সব মিলিয়ে দেশের স্বর্ণবাজার এখন এক অদ্ভুত ভারসাম্যহীন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ—সব পক্ষই এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। একদিকে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় মুদ্রার দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা দামকে আরও চাপে ফেলছে। এর মধ্যে বাজুসের ধারাবাহিক দাম সমন্বয় যেন এই অস্থির বাজারের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি আগামী মাসগুলোতে ডলারের সংকট আরও প্রকট হয় বা আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকে, তবে বাংলাদেশে ভরি প্রতি সোনার দাম ২ লাখ ২০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের এখনই সচেতন ও হিসেবি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

স্বর্ণ—যা একসময় কেবল বিলাসিতা ও ঐশ্বর্যের প্রতীক ছিল—আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্যও এক অর্থনৈতিক সূচক হয়ে উঠেছে। প্রতিবার দাম বাড়লে তা কেবল গহনার বাজারেই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটায়। তাই বাজারে এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি শুধু ক্রেতাদের উদ্বিগ্নই করছে না, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন পথে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নও নতুন করে উত্থাপন করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত