গাজায় নতুন সংঘর্ষে নিহত সাংবাদিক সালেহ আলজাফারাওয়ি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
গাজায় নতুন সংঘর্ষে নিহত সাংবাদিক সালেহ আলজাফারাওয়ি

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজা উপত্যকা একবার ভেবেছিল, হয়তো রক্তপাতের অবসান ঘটেছে। কিন্তু সেই আশার স্থলে আবারও নেমে এসেছে মৃত্যু ও আতঙ্কের ছায়া। রবিবার ফিলিস্তিনের গাজা সিটিতে নতুন করে শুরু হওয়া সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন তরুণ সাংবাদিক সালেহ আলজাফারাওয়ি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এই সাংবাদিকের নিহত হওয়ার ঘটনা পুরো গাজাজুড়ে নতুন করে শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, গাজা সিটির সাবরা এলাকায় হামাসের নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় দুগমুশ গোত্রের সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সালেহ। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তিনি সেদিন সকালে ক্যামেরা হাতে ওই এলাকায় প্রবেশ করেন স্থানীয় পরিস্থিতির ছবি তুলতে ও ভিডিও ধারণ করতে। কিন্তু বিকেলের দিকেই তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

পরবর্তীতে আল জাজিরার যাচাইকরণ সংস্থা সানাদ একাধিক ভিডিও বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করে যে, প্রেস লেখা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা সালেহর নিথর দেহ একটি ট্রাকের পেছনে পড়ে আছে। ফুটেজগুলো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে শোকের ঢেউ বয়ে যায়। সহকর্মী সাংবাদিকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সাংবাদিক নিরাপদ নয় গাজায়।”

ফিলিস্তিনের স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, রবিবার সকালে হামাসের নিরাপত্তা বাহিনী সাবরা এলাকায় প্রবেশ করে দুগমুশ গোত্রের এক সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ঘেরাও করে। অভিযোগ রয়েছে, এই গোত্রের কিছু সদস্য ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর সঙ্গে গোপনে লেনদেন করছে এবং অস্ত্র পাচারের সঙ্গে জড়িত। এই খবরেই এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হলে নিরীহ সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক সালেহ মাঝখানে পড়ে যান।

গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানান, “সংঘর্ষে জড়িত ছিল ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত এক সশস্ত্র মিলিশিয়া। নিরাপত্তা বাহিনী যখন তাদের ঘিরে ফেলে, তখন মিলিশিয়ার সদস্যরা দক্ষিণ গাজা থেকে ফেরা বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের ওপরও হামলা চালায়।” তবে তিনি সালেহর মৃত্যুর বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি, তদন্ত চলমান আছে বলেই জানান।

ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়ন এক বিবৃতিতে সালেহর মৃত্যুকে “পেশাগত দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় শহীদ হওয়া” বলে উল্লেখ করেছে। তারা আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে, গাজায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং চলমান দমননীতি বন্ধে জরুরি উদ্যোগ নিতে। বিবৃতিতে বলা হয়, “যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সাংবাদিকদের হত্যা বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, গাজার ভেতর এখনো শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।”

সালেহ আলজাফারাওয়ি ছিলেন এক তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক। গত এক বছরে তিনি গাজার যুদ্ধ, ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার, এবং মানবিক বিপর্যয়ের ওপর অসংখ্য ভিডিও প্রতিবেদন করেছেন। তার তৈরি কিছু ফুটেজ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয়। সহকর্মীরা বলছেন, সালেহ সবসময় ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করতেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন—‘বিশ্বকে গাজার বাস্তবতা জানাতে হলে, সত্যের মুখোমুখি হওয়াই একমাত্র উপায়।’

গাজায় এখনো অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও গোত্রীয় বিভাজন প্রতিদিনই নতুন সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। যুদ্ধবিরতির পর স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে। হামাস এখন প্রশাসনিকভাবে পুরো উপত্যকা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, আর স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া। এই জটিল বাস্তবতার মধ্যেই সাংবাদিকদের কাজ করা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

জাতিসংঘের এক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, “গাজায় সাংবাদিকরা এখন দুই আগুনের মধ্যে আটকা পড়েছেন। একদিকে ইসরাইলি আগ্রাসন ও নজরদারি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত ও গোত্রীয় সহিংসতা। এ অবস্থায় সাংবাদিকতার ন্যূনতম স্বাধীনতা রক্ষা করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাবরা এলাকা এখনো ভয় ও উত্তেজনায় ভরপুর। সংঘর্ষের পর পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে হামাসের নিরাপত্তা বাহিনী। ঘরে ঘরে তল্লাশি চলছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, সংঘর্ষ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতের আঁধারে ধোঁয়া উড়ছে, মাঝে মাঝে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে, আর আহতদের ট্রাকে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

গাজার সাধারণ মানুষ যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। কেউ ঘর মেরামত শুরু করেছিল, কেউ স্কুল পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হঠাৎ এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত আবারও তাদের মনে ভয়ের জন্ম দিয়েছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী আল জাজিরাকে বলেন, “আমরা ভাবছিলাম, হয়তো এখন বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে পারব। কিন্তু আজ আবার বন্দুকের শব্দ শুনে মনে হলো, আমাদের শান্তি এখনো অনেক দূরে।”

গাজার মানবাধিকার সংস্থা “আল-মিজান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস” এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সালেহ আলজাফারাওয়ির মৃত্যু কেবল এক সাংবাদিকের মৃত্যু নয়, এটি গাজার মুক্ত সংবাদমাধ্যমের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ তদন্ত দাবি করেছে।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংস্থা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) তাদের বিবৃতিতে বলেছে, “গাজায় সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা বন্ধ করতে হবে। আমরা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও হামাস প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই, সালেহ আলজাফারাওয়ির হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে।”

গাজার সাংবাদিক মহলে সালেহকে মনে করা হয় “নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর” হিসেবে। যুদ্ধের সময় তিনি সামাজিক মাধ্যমে যেসব ভিডিও ও প্রতিবেদন শেয়ার করতেন, তা লাখ লাখ মানুষ দেখত। অনেকেই তার ক্যামেরায় ধরা পড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতার মধ্যে মানবিকতার আলো খুঁজে পেতেন।

সালেহর পরিবার জানিয়েছে, তিনি রোববার সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন “কিছু দ্রুত শট নিতে”। তারপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বিকেলের দিকে গুলির খবর শোনার পর পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে, পুলিশ স্টেশনে, এমনকি মরচুয়ারিতেও খোঁজ করেন। রাতেই সামাজিক মাধ্যমে তার মরদেহের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পরিবারের আশা ভেঙে যায়। তার মা বলেছেন, “সে শুধু সত্যটা দেখাতে চেয়েছিল। তার ক্যামেরাই ছিল তার একমাত্র অস্ত্র।”

গাজার বর্তমান পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। যদিও যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর, কিন্তু বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সংকট ও পুনর্গঠনের বিলম্ব উপত্যকাটিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, যদি দ্রুত অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না হয়, তবে এই সংঘর্ষ আরও বিস্তৃত হতে পারে।

সালেহ আলজাফারাওয়ির মৃত্যু তাই শুধু এক সাংবাদিকের মৃত্যুই নয়, বরং গাজার ভেতরে চলমান অনিশ্চয়তা, বিভাজন ও অস্থিরতার প্রতীক। তার মৃত্যু আবারও প্রমাণ করল—যুদ্ধের পরেও গাজায় সত্যের জন্য কাজ করা মানে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। তবুও গাজার তরুণ সাংবাদিকেরা থামতে চান না, কারণ তারা জানেন, বিশ্ব যেন ভুলে না যায়, গাজায় এখনো জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সত্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত