প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলতি বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক–আইএমএফের বার্ষিক যৌথ সভার দ্বিতীয় দিনে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ (World Economic Outlook, October 2025) প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
আইএমএফ সাধারণত পঞ্জিকাবর্ষ ধরে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রকাশ করে। সংস্থাটির এই নতুন অনুমান বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে যখন সরকার চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আইএমএফ একই পূর্বাভাস দিয়েছিল—অর্থাৎ ৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এবারও সংস্থাটি সেই অনুমান পরিবর্তন না করে একই হারে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা পুনর্ব্যক্ত করেছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের গতিপ্রকৃতি এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
আইএমএফের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং তা ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, এই প্রবৃদ্ধির গতি অর্জনে মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আমদানি নির্ভর অর্থনীতির চাপে বড় বাধা তৈরি হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরে গড় সার্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছাবে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) — এই দুটি সংস্থা অর্থবছর ধরে প্রবৃদ্ধির হিসাব করে থাকে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অপরদিকে, এডিবি বলেছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৫ শতাংশের কাছাকাছি। তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, আইএমএফের পূর্বাভাস সবচেয়ে নিচের দিকে অবস্থান করছে, যা অর্থনৈতিক বাস্তবতার কঠিন দিকগুলোকে সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ সরকার যে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনের ক্ষেত্রে আইএমএফের এই পূর্বাভাসকে অনেকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। কারণ, চলমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে তারল্য ঘাটতি এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ অর্থনীতির ওপর বাড়তি ভার তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রপ্তানি আয়ে স্থবিরতা এই ধীরগতির অন্যতম কারণ।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ২ শতাংশে স্থির থাকবে। অর্থাৎ, বৈশ্বিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি তার সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে পারছে না। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত ও নেপাল তুলনামূলকভাবে ভালো প্রবৃদ্ধির ধারায় রয়েছে। ভারতের প্রবৃদ্ধি যেখানে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকা দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক–আইএমএফের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলও উপস্থিত রয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত প্রতিনিধি দলটি শুধু মূল অধিবেশনেই নয়, বরং সাইড লাইনে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতেও অংশ নিচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, এসব বৈঠকে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান ঋণ কর্মসূচি, আর্থিক খাত সংস্কার, অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং প্রবাসী আয়ে স্বচ্ছতা আনয়নের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
বিশেষ করে আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তি অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সেখানে আলাপ চলছে। বাংলাদেশ সরকার এই কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী ব্যাংক খাতের সংস্কার, মুদ্রানীতি কঠোরকরণ ও বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করার পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এসব সংস্কারের ফলাফল কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—তা নিয়েও আইএমএফের পর্যবেক্ষণ জারি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের এই পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। তাঁরা মনে করছেন, কেবল সরকারি বিনিয়োগ বা বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি রপ্তানি খাতে পণ্য বৈচিত্র্য, কৃষি ও শিল্পখাতে প্রযুক্তি উদ্ভাবন, এবং শ্রমবাজারে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে না পারলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এক সময় যে স্থিতিশীলতা ও গতিশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা নানা চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বৈদেশিক ঋণের সুদের বোঝা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আইএমএফের এই সর্বশেষ পূর্বাভাস তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত, যা নীতিনির্ধারকদের সামনে বাস্তবতার আয়না তুলে ধরছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও শক্ত ভিত্তিতে ফিরে আসবে—এই প্রত্যাশা এখন নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ জনগণের। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজন হবে কার্যকর নীতি, জবাবদিহি, এবং সবচেয়ে বড় কথা—বাস্তববাদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। আইএমএফের এই রিপোর্ট যেন সেই বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।