প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বাজারে আবারও রেকর্ড গড়ল স্বর্ণের দাম। বুধবার (১৫ অক্টোবর) থেকে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৩২ টাকায়—যা বাংলাদেশের স্বর্ণ বাজারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মঙ্গলবার রাতে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন এ মূল্য ঘোষণা করে জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
বাজুসের সর্বশেষ ঘোষণার আগে, মাত্র দুই দিন আগেই অর্থাৎ ১৩ অক্টোবর দেশে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সেদিন ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি প্রতি দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ১৩ হাজার ৭১৯ টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের আরও ঊর্ধ্বগতির কারণে আবারও নতুন রেকর্ড গড়ল দেশের স্বর্ণবাজারে।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হবে। ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) বিক্রি হবে ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৩২ টাকায়, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৬ হাজার ৪৯৯ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৭৭ হাজার ১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৫১ টাকা।
বাজুস আরও জানিয়েছে, স্বর্ণের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সরকার-নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস-নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যুক্ত করতে হবে। তবে গয়নার ডিজাইন, ওজন এবং মানভেদে মজুরির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। অর্থাৎ, স্বর্ণের অলংকার কিনতে গেলে ক্রেতাদের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণে এসব উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্বর্ণের এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি এখন দেশের সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বিয়ে-পরিকল্পনাকারী পরিবার পর্যন্ত সবাইকে ভাবনায় ফেলেছে। গয়নার দোকানগুলোর বিক্রেতারাও বলছেন, ক্রেতাদের আগ্রহ থাকলেও উচ্চমূল্যের কারণে বিক্রি অনেকটা কমে গেছে। ঢাকার নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, বনানী ও যমুনা ফিউচার পার্কের জুয়েলারি দোকানগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, আগের বছরের তুলনায় বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এক দোকানদার জানান, “ক্রেতারা দোকানে আসছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন, কিন্তু কেনার সাহস পাচ্ছেন না। দিনে দিনে স্বর্ণ যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।”
অন্যদিকে, যারা স্বর্ণে বিনিয়োগ করে থাকেন, তাদের কাছে এটি একটি সম্ভাবনার সময়। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়া মানেই দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মার্কিন ডলারের অবমূল্যায়ন এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ায় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন। এতে করে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম টানা কয়েক মাস ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধাবস্থা, মুদ্রাস্ফীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রমাগত স্বর্ণ কেনার প্রবণতা ভবিষ্যতেও স্বর্ণের দাম বাড়িয়ে রাখতে পারে।
বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। স্থানীয় জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২,৬০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। এর সঙ্গে ডলার সংকট ও আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে মূল্য আরও বাড়তে বাধ্য হচ্ছে। ফলে কাঁচামালের দাম বাড়লে স্থানীয় পর্যায়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে স্বর্ণের খুচরা বাজারে।
বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট ৬৫ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭ বার বেড়েছে, আর কমেছে মাত্র ১৮ বার। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি মাসেই প্রায় ৬ বার করে দাম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। তুলনামূলকভাবে ২০২৪ সালে ৬২ বার দাম সমন্বয় হয়েছিল, তখন ৩৫ বার বেড়েছিল এবং ২৭ বার কমেছিল। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, ২০২৫ সালে স্বর্ণের বাজার ছিল আরও বেশি অস্থির।
অন্যদিকে, রুপার বাজারে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। দেশে বর্তমানে ২২ ক্যারেট রুপার প্রতি ভরি বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ২০৫ টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে রুপার সর্বোচ্চ দাম। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৫ হাজার ৯১৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ৫ হাজার ৭৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৮০২ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ছে পরোক্ষভাবে। বিয়েশাদি, উৎসব কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণের অলংকার কেনা এখন অনেক পরিবারের জন্য বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু পরিবার এখন বিকল্প হিসেবে হালকা ক্যারেটের গয়না বা রুপার গয়না বেছে নিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, স্বর্ণের এই ক্রমবর্ধমান দাম দেশের সার্বিক মুদ্রাস্ফীতির চিত্রের প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম যত বাড়ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ডলার সংকট, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, এই পরিস্থিতি সাময়িক নয়—বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত বহন করছে।
তবে বাজুসের নেতারা আশাবাদী যে, বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দাম স্থিতিশীল হলে দেশের বাজারেও তা ধীরে ধীরে সমন্বিত হবে। সংগঠনের এক কর্মকর্তা জানান, “আমরা আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণ করি। বৈদেশিক বাজারে যদি স্থিতিশীলতা আসে, তাহলে দেশেও দাম কিছুটা কমে আসবে।”
বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণ শুধু একটি মূল্যবান ধাতু নয়, বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে আস্থা, মর্যাদা ও বিনিয়োগের প্রতীক। কিন্তু ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি সেই প্রতীকের নাগাল যেন ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। তবু স্বর্ণের প্রতি মানুষের অনুরাগ কমেনি—কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় স্বর্ণই অনেকের কাছে নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে ওঠে।
এভাবেই ২০২৫ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি এসে বাংলাদেশের স্বর্ণ বাজার আবারও ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখল। প্রশ্ন একটাই—এই স্বর্ণের দাম আর কতদূর যাবে? উত্তরটি হয়তো লুকিয়ে আছে বৈশ্বিক অর্থনীতির পরবর্তী উত্থান-পতনের মধ্যেই।