প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি কার্যকর থাকা অবস্থায় ইসরাইলি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সতর্ক করেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ অব্যাহত থাকলে এর ফল হবে “ভয়াবহ ও বিপজ্জনক”। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এই হুঁশিয়ারির পর।
মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রাতে তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় গাজায় অন্তত নয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেক আহত হয়েছেন। তার অভিযোগ, “এই হামলা যুদ্ধবিরতির চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন, যা শুধু মানবিক আইন নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতিরও অপমান।”
ইসমাইল বাঘাই আরও বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনারা ও চরমপন্থি দখলদাররা ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমি ধ্বংস করছে, শতাব্দী প্রাচীন অলিভ বাগান জ্বালিয়ে দিচ্ছে, আবাসিক বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে এবং মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদে অবমাননাকর আচরণ চালিয়ে যাচ্ছে। “এই কর্মকাণ্ডগুলো যুদ্ধবিরতির ছায়াতেও আগ্রাসনেরই প্রতিচ্ছবি,” তিনি বলেন।
ইরানের মুখপাত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুদ্ধবিরতির গ্যারান্টিদাতা দেশগুলো—বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, কাতার এবং জাতিসংঘ—কে অবিলম্বে ইসরাইলের এই কর্মকাণ্ডের দায়ভার নির্ধারণ করতে হবে এবং তাদের বাধ্য করতে হবে চুক্তির শর্ত মেনে চলতে। “যদি এই আগ্রাসন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে পরিণতি হবে ভয়াবহ,” সতর্ক করেন বাঘাই।
তিনি আরও বলেন, “ইসরাইল অতীতেও বারবার যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে। তারা চুক্তিকে ব্যবহার করে সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করেছে, ফিলিস্তিনিদের ওপর আরও হামলার সুযোগ তৈরি করেছে। এবারও সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।” ইরানের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য আসার পর মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার ঝড় উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ইরানের এই হুঁশিয়ারি মূলত গাজায় চলমান সহিংসতার সর্বশেষ পর্বের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এসেছে। মঙ্গলবারই গাজা সিটির দুটি এলাকায় ইসরাইলি গুলিতে নয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যুদ্ধবিরতির খবর শোনার পর কিছু মানুষ ঘরে ফেরার চেষ্টা করছিলেন, কেউ খাদ্য ও পানি সংগ্রহে বের হয়েছিলেন—তখনই হামলার শিকার হন তারা।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের বিবৃতিতে দাবি করেছে, সেনাদের “অত্যন্ত কাছাকাছি” চলে এসেছিল কিছু ব্যক্তি, যাদের তারা “সন্দেহভাজন হামলাকারী” মনে করে গুলি চালিয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, নিহতরা সবাই বেসামরিক মানুষ, যাদের কেউই কোনো ধরনের সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না।
ইরান এই ঘটনাকে “যুদ্ধবিরতির ছদ্মবেশে গণহত্যার ধারাবাহিকতা” বলে উল্লেখ করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসরাইল যে এখনো আক্রমণ চালাচ্ছে, তা প্রমাণ করে তারা কোনো আন্তর্জাতিক নীতি বা মানবিক সীমারেখা মানে না।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “যুদ্ধবিরতি মানে যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, কিন্তু অন্তত যুদ্ধের বিরতি। সেই বিরতিকেও যদি রক্তে ভাসানো হয়, তবে শান্তি প্রক্রিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এই কঠোর ভাষার বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, এটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের ইঙ্গিতও বহন করে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, গাজায় ইসরাইলের কার্যক্রম যদি অব্যাহত থাকে, তবে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যার ফল হতে পারে আরও বড় আকারের সংঘাত।
তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি একাধিকবার বলেছেন, “ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়।” গত বছরের যুদ্ধ চলাকালেও ইরান হামাসের প্রতি রাজনৈতিক সহায়তা বাড়ায় এবং বিভিন্ন আরব দেশকে ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়।
এদিকে, ইসরাইল এখন পর্যন্ত ইরানের সর্বশেষ হুঁশিয়ারির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউভ গালান্ট মঙ্গলবার বলেন, “ইসরাইল যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, কিন্তু নিরাপত্তা হুমকি দেখা দিলে আমরা বসে থাকব না।” এই মন্তব্যকে অনেকেই নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন।
গাজা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। দুই বছর ধরে চলমান যুদ্ধের ফলে লাখো মানুষ গৃহহীন, খাদ্য ও ওষুধের সংকটে জর্জরিত। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৬৮ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। হাসপাতালগুলো ভেঙে পড়েছে, স্কুলগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, আর মানুষের মন ভরে গেছে হতাশায়।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের হুঁশিয়ারি নতুন করে আগুন জ্বালিয়ে দিল কূটনৈতিক মহলে। ওয়াশিংটন থেকে ব্রাসেলস, কায়রো থেকে দোহা—সব জায়গায় এখন আলোচনা, এই হুঁশিয়ারির অর্থ কী? ইরান কি আরও সরাসরি ভূমিকা নিতে পারে? মধ্যপ্রাচ্য কি আবারও নতুন এক সংঘাতের মুখে?
তেহরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজা শাহরুখ বলেন, “ইরান শুধু কথার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে না; এটি এক ধরনের কূটনৈতিক বার্তা, যা ইসরাইলের মিত্রদের জন্যও সতর্কতা। যদি ইসরাইল যুদ্ধবিরতি ভেঙে আরও আগ্রাসন চালায়, তবে পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বলবে।”
ফিলিস্তিনের রামাল্লা থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক জানান, গাজার মানুষ এখন প্রতিটি রাত কাটাচ্ছেন আতঙ্কে। যুদ্ধবিরতির পরেও ড্রোনের গুঞ্জন, গুলির শব্দ আর বিস্ফোরণের আতঙ্কে শিশুরা ঘুমাতে পারছে না। এক গাজাবাসী নারী বলেন, “শান্তি শুধু খবরের কাগজে আছে, বাস্তবে তা নেই।”
যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের এই নতুন অধ্যায় কেবল ফিলিস্তিন বা ইসরাইল নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইরানের সতর্কবার্তা এখন যেন এক অশনি সংকেত—যদি আগ্রাসন বন্ধ না হয়, তবে এই যুদ্ধের আগুন শুধু গাজার সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, জ্বলে উঠবে পুরো অঞ্চল।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মানবিক সংকটের এই সময়ে বড় শক্তিগুলোর নির্লিপ্ততা যেন যুদ্ধবিরতির আশাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। গাজার এক সাংবাদিকের ভাষায়, “এখন আমরা শুধু বাঁচতে চাই—কোনো পক্ষের জয় নয়, শুধু জীবন।”
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে তাই এখন এক অদ্ভুত নীরবতা—যা ভয়, ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তায় ভরা। আর ইরানের কণ্ঠে উচ্চারিত সেই সতর্কবার্তা যেন সেই নীরবতার ভেতর গর্জে ওঠা বজ্রধ্বনির মতো—যুদ্ধবিরতির শর্ত ভাঙলে, ফল হবে ভয়াবহ।










