“আগেও গাজা পুনর্গঠিত হয়েছে, এবার আর আশার আলো নেই”

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৯ বার
“আগেও গাজা পুনর্গঠিত হয়েছে, এবার আর আশার আলো নেই”

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

১৯৪৮ সালের সেই অস্থির দিনগুলোর কথা এখনো যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে আয়িশ ইউনুসের। তখন তার বয়স মাত্র ১২ বছর। ব্রিটিশ শাসনের শেষভাগে যখন প্রথম আরব–ইসরাইল যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ে, তখনই শুরু হয় তার দীর্ঘ নির্বাসনের গল্প। ফিলিস্তিনের বারবারা গ্রাম থেকে নিজের পরিবারসহ পালিয়ে আসতে হয়েছিল প্রাণ বাঁচাতে। আজ ৮৯ বছর বয়সে সেই স্মৃতি মনে পড়লেই কেঁপে ওঠেন তিনি।

আয়িশের ভাষায়, “আমরা ভয়ে কাঁপছিলাম, জানতাম না বাঁচতে পারব কি না। ইহুদিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো ক্ষমতা আমাদের ছিল না। তাই পালানো ছাড়া উপায় ছিল না।” সেই পালানোই যেন তার জীবনের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেই সময় দাদির সঙ্গে একটি উটে চড়ে বালুময় পথ পাড়ি দেন আয়িশ। বারবারা থেকে সাত মাইল দক্ষিণে মিসর-অধিকৃত এক অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছান তারা। ছোট্ট গাজা উপত্যকাটি তখন মাত্রই মিসরের দখলে আসে। আজ সেই জায়গাটিই বিশ্বের অন্যতম আলোচিত যুদ্ধক্ষেত্র—গাজা।

প্রায় সাত লাখ ফিলিস্তিনি ১৯৪৮-৪৯ সালের যুদ্ধে গৃহহারা হয়ে শরণার্থী হন। তাদের মধ্যে আনুমানিক দুই লাখ গিয়েছিলেন গাজায়। আয়িশের পরিবারও আশ্রয় নেয় জাতিসংঘ পরিচালিত একটি শিবিরে। সেখানে অল্প কিছু কাঠ ও কাপড় দিয়ে তৈরি এক অস্থায়ী আশ্রয়েই শুরু হয় নতুন জীবন।

কিন্তু ইতিহাস যেন আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে আয়িশের জীবনে। ৮৯ বছর বয়সে আবারও তাঁবুতে ফিরে এসেছেন তিনি। খান ইউনিসের কাছাকাছি আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি অস্থায়ী তাঁবুতে এখন তার বসবাস। ইসরাইলি বাহিনীর উচ্ছেদ আদেশের পর রাফাহ শহরের নিজ বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। চারতলা বাড়িটি কামানের গোলায় গুঁড়িয়ে গেছে বলে ধারণা তার। এখন সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে অল্প দূরেই তাঁবু গেড়ে আছেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে।

দিন কাটছে সীমিত পানি আর অল্প খাদ্যে। রান্না হয় খোলা আকাশের নিচে। আয়িশ বলেন, “আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, আবার সেখানেই ফিরে এসেছি। একসময় আশ্রয় বানিয়ে বাড়ি গড়েছিলাম, এখন আবার তাঁবুতে ফিরতে হয়েছে। জানি না ভবিষ্যতে কী আছে আমাদের জন্য।”

তবে এই দুর্যোগের মধ্যেও তিনি আশা ছাড়েননি নিজের জন্মভূমি বারবারায় ফিরে যাওয়ার। বলেন, “শেষ জীবনে যদি আর কিছু না পাই, অন্তত বারবারার মাটিতে ফিরে যেতে চাই।”

অতীতের ছায়া, বর্তমানের অনিশ্চয়তা

যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময়ের সাম্প্রতিক চুক্তিতে গাজায় কিছুটা স্বস্তির হাওয়া বইছে। তবুও আয়িশ আশাবাদী নন। তার মতে, “শান্তি হয়তো আসবে, কিন্তু ইসরাইলিরা তাদের ইচ্ছেমতো কাজই করবে। গাজার ভবিষ্যৎ খুব অন্ধকার।”

আয়িশের জীবনের গল্প যেন গাজারই প্রতিচ্ছবি। ১৯ বছর বয়সে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্যে ডিগ্রিও অর্জন করেন। পরে খাদিজাকে বিয়ে করে সংসার গড়েন। তাদের ১৮ সন্তান ও ৭৯ জন নাতি-নাতনি। যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও এই বিশাল পরিবারই তার জীবনের একমাত্র সান্ত্বনা।

বর্তমানে পরিবারটি শরণার্থী শিবিরে তিন কক্ষের একটি বাড়িতে স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সন্তানদের প্রায় সবাই উচ্চশিক্ষিত—কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ নার্স। পাঁচজন উপসাগরীয় দেশে কাজ করেন, আর এক ছেলে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত লন্ডনে।

তবে আয়িশ নিজে কখনো রাজনীতিতে যুক্ত হননি। স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি, আর এলাকার বিরোধ মীমাংসায় ছিলেন সকলের আস্থাভাজন। হামাস বা ফাতাহ—দুই পক্ষই তাকে সম্মান করত। কিন্তু ২০০৭ সালে ফাতাহ-হামাস সংঘর্ষে তার মেয়ে ফাদওয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।

ভবিষ্যতের কোনো আলো নেই

গাজার পুনর্গঠন নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার শেষ নেই। কিন্তু আয়িশের মতে, “গাজা আজ এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ। ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল—সব কিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা এলেও পুরোপুরি পুনর্গঠন সম্ভব নয়।”

তিনি মনে করেন, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হলে তার নাতি-নাতনিরা গাজার পুনর্গঠনে অংশ নিতে পারবে, কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাব তাদের সেই সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে। অনেকেই ইতিমধ্যে বিদেশে চলে যাচ্ছে ভালো জীবনের আশায়।

তার চোখে গাজা আজ এক সীমাহীন অনিশ্চয়তার নাম। ৭৭ বছর আগে যে জীবন শুরু হয়েছিল শরণার্থী হিসেবে, সেই চক্র আজও শেষ হয়নি। তিনি বলেন, “আমরা বারবার হারিয়েছি সব কিছু, কিন্তু কখনোই হারাইনি বেঁচে থাকার ইচ্ছা। তবু এবার মনে হয়, গাজার কোনো ভবিষ্যৎ আর নেই।”

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত