সিলেটের উন্নয়ন বৈষম্য দূর দাবিতে রোববার অবস্থান কর্মসূচি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭০ বার
সিলেটের উন্নয়ন বৈষম্য দূর দাবিতে রোববার অবস্থান কর্মসূচি

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বারবার বঞ্চিত হচ্ছে এই অঞ্চল। অবহেলার এই চিত্র এবার আরও জোরালোভাবে সামনে আনতে রোববার (১ নভেম্বর) সিলেট নগরীতে এক বিশাল অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। সকাল ১১টায় নগরীর সিটি পয়েন্ট থেকে সুরমা মার্কেট পয়েন্ট পর্যন্ত এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।

সিলেটের ন্যায্য দাবি আদায়ে গঠিত নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘সিলেট আন্দোলন’-এর উদ্যোগে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর কুমারপাড়াস্থ বাসায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় কর্মসূচির ঘোষণা দেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

সভায় বক্তারা বলেন, দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে সিলেট বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। বিভাগ হিসেবে সিলেটের অবদান বিশাল হলেও উন্নয়ন বরাদ্দ ও অবকাঠামো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই অঞ্চল এখনো পিছিয়ে। গত ১২ অক্টোবর কোর্ট পয়েন্টে আয়োজিত সমাবেশে সরকারকে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল, যাতে উন্নয়ন বৈষম্য দূর করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাই ‘সিলেট আন্দোলন’ এবার রাজপথে অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন করে দাবি জানাতে যাচ্ছে।

মতবিনিময় সভায় আরিফুল হক চৌধুরী জানান, সিলেটবাসীর ন্যায্য দাবি শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং এটি সম্মানের প্রশ্ন। তিনি বলেন, “আমরা আর অবহেলা চাই না। সিলেট দেশের রাজস্ব আয়ের বড় একটি অংশ যোগান দেয়, অথচ উন্নয়নের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এই বৈষম্যের অবসান ঘটাতে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”

তিনি আরও জানান, শুক্রবার জুমার খুতবায় সিলেট অঞ্চলের ইমামদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তাঁরা মসজিদে সিলেটের উন্নয়ন বঞ্চনার বিষয়টি তুলে ধরেন। পাশাপাশি মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডার দায়িত্বশীলদের প্রতিও একই আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। শনিবার বাদ মাগরিব হযরত শাহজালাল (র.) দরগাহ চত্বর থেকে কর্মসূচির সমর্থনে একটি মশাল মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আরিফুল হক চৌধুরী সভায় উল্লেখ করেন, সম্প্রতি তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা এবং রেল উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সড়ক যোগাযোগে কিছুটা অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে বলে তিনি জানান। তাঁর ভাষায়, “ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এখন কিছুটা ভালো হলেও রেল যোগাযোগে পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক নয়। টিকিটের সংকট, অবকাঠামো উন্নয়নের ধীরগতি ও সেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে।”

তিনি বলেন, রেল উপদেষ্টা তাঁকে জানিয়েছেন, সিলেটের জন্য ১০টি নতুন বগি বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হলে জনগণের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। আরিফুল হক বিমান ভাড়ার উচ্চমাত্রা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, “সিলেট থেকে ঢাকায় বিমানের ভাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি, যা সাধারণ যাত্রীর নাগালের বাইরে।”

সভায় আরিফুল হক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ সংক্রান্ত বঞ্চনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২১ সালে সিলেটের উপজেলা ও ইউনিয়নগুলোর রাস্তা-ঘাট সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ২৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু এখনো প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়নি, বরং নতুন করে ডিপিপি তৈরি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা সিলেটবাসীর জন্য হতাশাজনক।

তিনি বলেন, বাদাঘাট এলাকায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এতে আগামী রমজানে সিলেটে পানির সংকট তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। “যদি এখনই দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে রমজানে সিলেট শহরে পানির জন্য হাহাকার দেখা দিতে পারে,”—যোগ করেন সাবেক মেয়র।

আন্দোলনের এই অবস্থান কর্মসূচিকে ঘিরে ইতিমধ্যে সিলেট নগরীতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, পেশাজীবী, পরিবহন শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠন একযোগে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, এবার সিলেটবাসী একাত্ম হয়ে উন্নয়ন বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ বার্তা দিতে যাচ্ছে।

সিলেট আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, তাদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে। তারা সরকারের কাছে একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরির দাবি জানিয়েছেন, যাতে সড়ক, রেল, বিমান, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতসহ সব ক্ষেত্রে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়।

সভা শেষে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “সিলেটের মানুষের দাবি কোনো রাজনৈতিক নয়, এটি ন্যায্য ও মানবিক দাবি। আমরা রাজপথে থাকব যতদিন পর্যন্ত না সরকার আমাদের এই ন্যায্য দাবিগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করছে। উন্নয়ন বঞ্চনা আর সহ্য করব না।”

এই অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে এখন সিলেট জুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অনেকে বলছেন, এই কর্মসূচি যদি শান্তিপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে এটি সিলেটের উন্নয়ন আন্দোলনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

রোববারের অবস্থান কর্মসূচি তাই শুধু একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, আশা ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সিলেটবাসী এখন দেখছে, তাদের কণ্ঠ কতটা শক্তভাবে দেশজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com