প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের মধ্যেই আবারও এক শোকাবহ ঘটনার জন্ম দিয়েছে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। তারা আরো এক ইসরায়েলি জিম্মির মৃতদেহ ফেরত দিয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির কাছে লাশটি হস্তান্তর করা হয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, মৃতদেহটি দ্রুত স্বদেশে নিয়ে আসা হয়েছে এবং এর পরিচয় শনাক্তের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসেম ব্রিগেডস জানিয়েছে, গাজার শুজাইয়া মহল্লার ধ্বংসস্তূপের নিচে উদ্ধার অভিযানে এই জিম্মির মৃতদেহ পাওয়া যায়। সংগঠনটির দাবি, এখনো অন্তত ছয়জন জিম্মির মৃতদেহ গাজায় রয়ে গেছে যাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ধ্বংসযজ্ঞের কারণে।
হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অব্যাহত বিমান হামলা ও স্থল অভিযানে গাজা সিটির বহু এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ফলে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম চালানো অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। ভারী যন্ত্রপাতি ও বুলডোজার প্রবেশের ওপর ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা থাকায় উদ্ধারকারীদের হাতে কোনো কার্যকর উপায়ও নেই। হামাস বলেছে, তারা মানবিক দিক বিবেচনা করেই এসব লাশ ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতার কারণে সময় লাগছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যতক্ষণ না গাজায় আটক সব জিম্মির লাশ ফেরত আসে, ততক্ষণ তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করবে না। এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল গাজায় মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী, খাদ্য ও পানি সরবরাহ পুনরায় চালু করা। ইসরায়েলের এই শর্তের কারণে এখন যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়নও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে হামাস এখন পর্যন্ত ২০ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে জীবিত মুক্তি দিয়েছে এবং ২২ জনের মৃতদেহ ফেরত দিয়েছে। ফেরত আসা মৃতদেহগুলোর বেশিরভাগই ইসরায়েলি নাগরিক, যাদের অনেকেই গত বছরের অক্টোবরের সংঘর্ষে অপহৃত হয়েছিল। হামাস ও ইসরায়েল উভয় পক্ষের বিবৃতিতে জানা যায়, অনেক জিম্মির অবস্থান এখনো অজানা। গাজা উপত্যকার বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে নিখোঁজদের খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই সংঘাত কেবল দুই পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোর করে তুলছে। প্রতিটি লাশ ফেরত আসার পেছনে একেকটি পরিবার পাচ্ছে শোকের সমাপ্তি, আবার নতুন করে উন্মোচিত হচ্ছে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি বলেছে, তারা উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মানবিক উদ্যোগের পরিধি বাড়াতে কাজ করছে, যাতে অন্তত মৃতদেহ ও আহতদের যথাযথ সেবা দেওয়া যায়।
গাজার সাধারণ মানুষের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। হাসপাতালগুলোতে ওষুধের ঘাটতি, পানির সংকট এবং বিদ্যুৎহীন অবস্থায় চিকিৎসাসেবা প্রায় ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও প্রতিদিনই গাজা থেকে নতুন নতুন ধ্বংসস্তূপের খবর আসছে। হামাস বলছে, গাজা সিটির পূর্বাঞ্চল প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানকার ঘরবাড়ি, স্কুল, এমনকি মসজিদগুলোও রেহাই পায়নি। এ অবস্থায় জিম্মিদের খোঁজে অভিযান চালানো মানে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ধ্বংসস্তূপে প্রবেশ করা।
ইসরায়েল বলছে, তারা আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যেই অভিযান পরিচালনা করছে এবং তাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র হামাসের সামরিক কাঠামো ধ্বংস করা। তবে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত পূরণে বিলম্ব ও মানবিক সহায়তায় বাধা দেওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ছে। তারা মনে করেন, জিম্মিদের লাশ ফেরত দেওয়া এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার কাজ সমান্তরালভাবে চালানোই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হামাসের এই উদ্যোগ ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার একটি নতুন পথ খুলে দিতে পারে, যদি উভয় পক্ষ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে। কারণ, দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে এমন উদ্যোগ প্রায়ই শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটায়। তবে বাস্তবে সেই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ অনেক দীর্ঘ ও অনিশ্চিত। গাজার পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই হাজারো জীবনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
মানবিকতার দৃষ্টিতে এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি যুদ্ধবিরতির জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে ধ্বংস, মৃত্যু ও শোকের ছায়া; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা—কীভাবে একটি লাশও ফিরিয়ে আনতে হয় মানবিক দায়িত্ববোধের কারণে, সেটাই এখন বিশ্বের সামনে এক বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।