গাজায় নির্বিচারে বেসামরিক হত্যা স্বীকার করলেন ইসরাইলি সেনারা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭৪ বার
গাজায় নির্বিচারে বেসামরিক হত্যা স্বীকার করলেন ইসরাইলি সেনারা

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজায় চলা ইসরাইলের আগ্রাসনে রক্তে ভেসে গেছে নিরীহ মানুষের জীবন। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যার ভয়াবহ চিত্র এখন বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে একে একে। এমনই একটি প্রামাণ্যচিত্রে ইসরাইলি সেনারা নিজেরাই স্বীকার করেছেন, কোনো যুদ্ধনীতি বা আন্তর্জাতিক আইন তোয়াক্কা না করেই তারা গাজায় বেসামরিক মানুষদের হত্যা করেছে। নিজেদের হাতে নিরস্ত্র মানুষের প্রাণ নেওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তারা, যা নাড়িয়ে দিয়েছে বিবেকবান বিশ্বকে।

ব্রিটিশ টেলিভিশন আইটিভির তৈরি নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘ব্রেকিং র‍্যাংকস : ইনসাইড ইসরাইলস ওয়ার’–এ ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) একাধিক সেনা অকপটে জানিয়েছেন, কীভাবে তাদেরকে গাজার সাধারণ মানুষদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে বলা হতো, এবং যুদ্ধের নামে কিভাবে নৃশংসতা চালানো হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রটি ব্রিটেনে প্রচারিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে অংশ নেওয়া সেনাদের কেউ কেউ নিজের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ পরিচয় গোপন রেখে তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

প্রামাণ্যচিত্রে ড্যানিয়েল নামে এক ট্যাংক ইউনিট কমান্ডার জানান, তাকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল— যদি সে গুলি চালাতে চায়, তাহলে চালাতে পারে, কেউ বাধা দেবে না। অর্থাৎ, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারে কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না। অন্য এক সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, “আমাদের বলা হতো, সন্দেহভাজন দেখলেই গুলি চালাও। বয়স, লিঙ্গ বা অবস্থান— কিছুই বিবেচ্য ছিল না।”

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

প্রকাশিত ভিডিও ও বিবৃতিতে দেখা যায়, আইডিএফের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্যদের যুদ্ধের নীতি শেখানো হলেও বাস্তব ময়দানে সেসব নীতি ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। ক্যাপ্টেন ইয়োতাম ভিল্ক নামে এক কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের শেখানো হয় ‘মিন্স, ইনটেন্ট অ্যান্ড অ্যাবিলিটি’— অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের হাতে অস্ত্র থাকতে হবে, ক্ষতির ইচ্ছা থাকতে হবে এবং তা করার সক্ষমতা থাকতে হবে। কিন্তু গাজায় এই তিনটির কোনো মানে ছিল না। কেউ যদি নিষিদ্ধ এলাকায় হাঁটে, তাহলেই সে সন্দেহভাজন।”

ইসরাইলি সেনাদের স্বীকারোক্তিতে আরও উঠে এসেছে, গাজার সাধারণ মানুষদের প্রায়ই ‘মানব ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। একাধিক সৈন্য বলেন, সামরিক অভিযান পরিচালনার সময় নারী-শিশুদের সামনে রেখে হামলা চালানো হতো, যাতে হামাস যোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণ করতে না পারে। এর ফলে বহু নিরীহ মানুষের প্রাণ ঝরে যায়।

আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে তারা জানিয়েছেন, আমেরিকা ও ইসরাইলের সহায়তায় পরিচালিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলোর কাছেও আইডিএফ সেনারা বিনা উসকানিতে বেসামরিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে। এসব হামলার কোনো সামরিক কারণ বা কৌশলগত ব্যাখ্যা নেই— সবই ছিল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা কমান্ডারের নির্দেশে পরিচালিত নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ।

একজন সেনা, যিনি ‘এলি’ নামে পরিচিত, প্রামাণ্যচিত্রে বলেন, “গাজায় জীবন ও মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না কোনো নিয়ম বা ফায়ারিং প্রটোকল মেনে। সিদ্ধান্ত আসে কমান্ডারের বিবেক থেকে, কখনো কখনো কেবল মনের খেয়াল থেকেই।” তিনি আরও যোগ করেন, “সেখানে শত্রু কাকে বলা হবে, তা সম্পূর্ণ মনগড়া। কেউ যদি দ্রুত হাঁটে, তাকে সন্দেহ করা হয়। কেউ ধীরে হাঁটলেও সে সন্দেহভাজন।”

প্রামাণ্যচিত্রটিতে ইসরাইলি সেনাদের ব্যক্তিগত জীবনের ভয়াবহ প্রভাবও তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা নির্মমতা অনেক সেনার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। কেউ কেউ যুদ্ধশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন, কেউবা আজও ভুগছেন ভয়াবহ মানসিক ট্রমায়। একজন সাবেক সৈন্য বলেছেন, “প্রতিদিন ঘুমাতে গেলেই গাজার শিশুদের মুখ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। আমরা যাদের হত্যা করেছি, তাদের চিৎকার আজও কানে বাজে।”

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ইসরাইলের এই কর্মকাণ্ড স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন দীর্ঘদিন ধরে গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর কর্মকাণ্ডের তদন্ত দাবি করলেও তেল আবিব সরকার তা অগ্রাহ্য করেছে। বরং ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এই ধরনের অভিযোগকে “রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা” বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

তবে আইটিভির এই প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘জাস্টিস ফর গাজা’ জানিয়েছে, “ইসরাইলি সেনারা নিজেরাই এখন স্বীকার করছে যে, গাজায় হত্যা কোনো দুর্ঘটনা নয়— ছিল পরিকল্পিত ও নির্দেশিত হত্যাযজ্ঞ।” সংস্থাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) নতুন করে তদন্ত শুরুর দাবি জানিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রামাণ্যচিত্রটি শুধু ইসরাইলি সেনাদের নৃশংসতা নয়, তাদের ভেতরের মানবিক সংকটও তুলে ধরেছে। বহু সেনা এখন নিজ দেশের যুদ্ধনীতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, গাজায় যা ঘটেছে, তা কোনো যুদ্ধ নয়— বরং নিরস্ত্র মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ।

গাজার যুদ্ধ যে শুধু রাজনৈতিক নয়, মানবিক বিপর্যয়ও সৃষ্টি করেছে, তা এ প্রামাণ্যচিত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গাজার শিশুদের কান্না, মায়েদের আহাজারি, ধ্বংসস্তূপে ঢাকা শহরের দৃশ্য— সবকিছুই যেন মানবতার কাছে এক অনন্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইসরাইলি সেনাদের এসব স্বীকারোক্তি সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তবে তা গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের এখনই উচিত এই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো। কারণ, গাজায় যে আগুন জ্বলছে, তা শুধু এক ভূখণ্ডের নয়— তা সমগ্র মানবতার বিবেককে পুড়িয়ে দিচ্ছে।

গাজার এই রক্তাক্ত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে এখন সবার মনে একটাই প্রশ্ন— কবে থামবে এই হত্যাযজ্ঞ, কবে ফিরবে মানবতার আলো? বিশ্ব যখন নীরব, তখন ইসরাইলি সেনাদের এই স্বীকারোক্তিই হয়ে উঠেছে গাজার মাটিতে ঘটে যাওয়া অবর্ণনীয় অপরাধের নীরব দলিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com