প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজধানীর সূত্রাপুরের কাগজি টোলার একটি ছোট্ট ভাড়াবাড়ি গত রাতের অগ্নিকাণ্ডের বিভীষিকায় স্তব্ধ হয়ে গেছে। ঘুমন্ত অবস্থায় এক পরিবারের শিশুসহ পাঁচজন সদস্য দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। প্রায় নিঃশব্দে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এলাকাবাসী ও স্বজনদের শোকে বাকরুদ্ধ করে তুলেছে।
দগ্ধ পরিবারটির কর্তা মো. রিপন পেদা পেশায় ভ্যানচালক। ৩৫ বছর বয়সী রিপনের সঙ্গে দগ্ধ হয়েছেন তার স্ত্রী মোছা. চাঁদনী (২৪), দুই ছেলে তামিম পেদা (১৬) ও রোকন পেদা (১৪) এবং মাত্র এক বছরের কন্যাশিশু আয়েশা। বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রত্যেকেরই শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। রিপনের শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ, চাঁদনীর ৪৫ শতাংশ, তামিমের ৪২ শতাংশ, রোকনের ৬০ শতাংশ এবং শিশুটি আয়েশার ৬৩ শতাংশ পুড়ে গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত গভীরে যখন সূত্রাপুরের মানুষ ঘুমে ডুবে ছিল, তখনই ভোররাতের নিস্তব্ধতাকে ছেদ করে বেরিয়ে আসে আগুনের লেলিহান শিখা আর আর্তনাদের শব্দ। পাঁচতলা বাড়ির নিচতলার একটি এককক্ষে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া থাকত। চাঁদনীর মামা জাকির হোসেন জানিয়েছেন, রাতে সবাই প্রতিদিনের মতোই একসঙ্গে ঘুমিয়ে ছিলেন। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত তা এখনো অজানা। হঠাৎ কক্ষে ছড়িয়ে পড়া আগুনে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দগ্ধ হন পরিবারের সবাই।
দগ্ধদের আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে উদ্ধার কাজ শুরু করেন এবং পরে তাদের দ্রুত জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। দগ্ধদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন চিকিৎসকরা, তবে এত বড় অংশ দগ্ধ হওয়ায় ঝুঁকি সব সময়ই বিদ্যমান বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
পরিবারটির গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে হলেও জীবিকার তাগিদে রিপন পেদা ঢাকায় ভ্যান চালাতেন। একমাত্র আয়েই কোনোরকমে চলে যেত পাঁচজনের সংসার। রাতারাতি সেই ছোট সংসার এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কীভাবে একটি অজানা আগুন এক নিমিষে একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দিতে পারে, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রতিবেশী ও স্বজনদের মনে।
এলাকাবাসী বলছেন, ভাড়াবাড়িগুলোতে গ্যাস লাইন ও বৈদ্যুতিক সংযোগের যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায়ই থাকে না। কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবেই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে বলে তাদের অভিযোগ। তবে প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে বিস্তারিত কারণ বের করার চেষ্টা চলছে।
এই আগুন কোনো বৈদ্যুতিক ত্রুটি, গ্যাস লিকেজ না কি অন্য কোনো অজানা কারণে লেগেছে—তা স্পষ্ট না হলেও এক নিমেষে নিভে গেছে এক পরিবারের স্বপ্ন আর হাসি-আনন্দ। হাসপাতালে দগ্ধ স্বজনদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন চিকিৎসকরা। তবে এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নগরীর ভাড়াবাড়ি ও নিম্নআয়ের মানুষের বাসস্থানগুলোতে জরুরি নিরাপত্তা জোরদারের দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে।
সূত্রাপুরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নিঃশব্দে ঘটে যাওয়া এই অগ্নিকাণ্ড যেন আরেকবার সতর্কবার্তা হয়ে রইল—নগরজীবনের প্রান্তিক মানুষের বাসস্থান নিরাপদ না হলে ঘুম আর স্বপ্ন দুটোই ভস্মীভূত হতে কতটুকু সময় লাগে!
একটি বাংলাদেশ অনলাইন