জুলাই অভ্যুত্থান সংবিধানের মূলনীতিতে নয়, ইতিহাসে চতুর্থ তফসিলেই জায়গা চান বিএনপি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫
  • ৪১ বার
বিএনপির ফাঁকা ২৭ আসন

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নিয়ে আবারও দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করলো। জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও তাৎপর্য নিয়ে সরকারের উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানালেও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, এ ঘোষণাপত্র সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় স্থান পাবে না—বরং এটি চতুর্থ তফসিলে যুক্ত করাই হবে বাস্তবসম্মত ও ইতিহাসসম্মত সিদ্ধান্ত।

বুধবার রাতে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছে বিএনপি। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে সম্প্রতি পাঠানো ‘জুলাই ঘোষণাপত্রের’ খসড়া নিয়ে দলীয় সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহল তাদের সুস্পষ্ট মত চূড়ান্ত করেছে।

দলটির নেতারা মনে করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়, তবে পুরো ঘোষণাপত্রকে সংবিধানের মূলনীতির অংশ করা রাজনৈতিক দিক থেকে জটিলতা সৃষ্টি করবে। বিএনপি মনে করছে, সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় এমন অন্তর্ভুক্তি হলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো রাজনৈতিক ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়েও একই দাবি তুলতে পারে কেউ কেউ—যেমন ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বা এক-এগারো-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধরে রাখার সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি হচ্ছে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে তা সংযুক্ত রাখা, যেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলো সংরক্ষিত থাকে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বুধবার রাতেই একটি সংশোধিত খসড়া তৈরি করে সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়েছে। খসড়ায় বিশেষ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পুনঃবিবেচনা করেছে দলটি। খসড়ার প্রথমেই পাকিস্তান আন্দোলন ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার ইতিহাসের অংশটিকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ আখ্যা দিয়ে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে বিএনপি। দলটির মতে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদা শুরু হয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকেই—এই গৌরবময় অর্জনই ঘোষণাপত্রের শুরুতে থাকাই যথার্থ।

খসড়ায় যে পয়েন্টে বলা হয়েছিল, ‘পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনির্মাণের ব্যর্থতা ও অপর্যাপ্ততা’—সেখানে ‘বিভিন্ন শাসনামল’ শব্দটি পরিবর্তন করে বিএনপি সরাসরি ‘আওয়ামী শাসনামল’ উল্লেখ করেছে। নেতাদের মতে, এভাবে দায়িত্ব ও ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

একইভাবে এক-এগারো প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সুপারিশ এসেছে। ‘ক্ষমতার সুষ্ঠু রদবদলের রাজনৈতিক ব্যর্থতার সুযোগে’ অংশটিকে পরিবর্তন করে বিএনপি লিখতে চায়—‘দেশি-বিদেশি চক্রান্তের সুযোগে’। তাদের ব্যাখ্যা, এক-এগারোর পটভূমি ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

এছাড়া বিএনপি স্পষ্ট করে দিয়েছে, ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনর্লিখন বা বাতিল নয়—তারা বর্তমান সংবিধানকেই প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও যুগোপযোগী করতে চায়। এর বাইরে ঘোষণাপত্র থেকে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ শব্দটিও ইতিমধ্যেই বাদ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপির পক্ষ থেকেও এতে কোনো আপত্তি ওঠেনি।

স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান-২০২৪ এ দেশের জনগণের বিজয়, সাহস আর গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক। আমরা চাই এটিকে যথাযথ মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক। তবে সেটি সংবিধানের মূলপ্রস্তাবনায় নয়—ইতিহাসের অঙ্গ হিসেবে সংবিধানের তফসিলে রাখা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতে পারে।’

সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশের প্রস্তুতি রয়েছে।

বিএনপির এই অবস্থানকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন দেশের নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার প্রতিফলন হিসেবে। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে এই ঘোষণাপত্র কীভাবে দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে স্থান পাবে—তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত