গাজার ক্লিনিকে লাইনে দাঁড়ানো মানুষের রক্তাক্ত সকাল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫
  • ৭০ বার

 

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

পূর্বতর কোনো পূর্বাভাস বা নিরাপত্তার আভাস ছাড়াই গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চল দেইর আল-বালাহতে একটি ক্লিনিকের সামনের লাইনে দাঁড়ানো অসহায় নারী-শিশুদের ওপর নেমে এলো মরণঘাতী হামলা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবিক সহায়তা সংস্থা প্রজেক্ট হোপ পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বাইরে বৃহস্পতিবার সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন শতাধিক ফিলিস্তিনি, যাদের বেশির ভাগই শিশুদের অপুষ্টি নিরাময়, সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি অসুখের চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। হঠাৎই ড্রোন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে সেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে উঠল চারপাশ।

স্থানীয় আল-আকসা মারটায়ারস হাসপাতাল জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন, এদের মধ্যে ৮ শিশু ও ২ নারী রয়েছেন। হাসপাতালে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মর্গের মেঝেতে সারি সারি লাশ, পাশে কান্নায় ভেঙে পড়া স্বজনেরা আর চিকিৎসকরা আহতদের বাঁচাতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই হামলার দায় স্বীকার করে বলেছে, তারা ‘হামাসের এক সন্ত্রাসী’কে লক্ষ্য করেছিল, সাধারণ মানুষের প্রাণহানিতে তারা দুঃখিত। তবে প্রজেক্ট হোপের প্রেসিডেন্ট রাবিহ টোরবে একে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই ক্লিনিকগুলো গাজার মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। এখানে দরিদ্র মা ও শিশুদের পুষ্টি, গর্ভকালীন ও প্রসূতিসেবা এবং ন্যূনতম চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেই নিরাপদ স্থানটিও আর সুরক্ষিত থাকল না।

প্রত্যক্ষদর্শী ইউসুফ আল-আইদি বলেন, ‘হঠাৎ ড্রোনের গুঞ্জন শোনা গেল। তারপরই ভয়াবহ বিস্ফোরণ। পায়ের নিচে মাটি কেঁপে উঠল, চারপাশ রক্তে ভেসে গেল, মানুষের চিৎকারে আকাশ ভারী হয়ে উঠল।’ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, রক্তাক্ত শিশু ও আহত মানুষরা রাস্তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে, কেউ আর উঠছে না, কেউ কাতরাচ্ছে—এই দৃশ্যের সত্যতা বিবিসি যাচাই করেছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহতদের একজন আত্মীয় ইন্তেসার বিবিসিকে বলেন, ‘আমার অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি মানাল এবং তার মেয়ে ফাতিমা আর নেই। মানালের ছেলে এখনো আইসিইউতে লড়ছে। তারা লাইনে দাঁড়িয়েছিল শুধু শিশুদের জন্য পুষ্টিসামগ্রী আনতে।’

আরেকজন নারী হাহাকার করে বললেন, ‘তাদের কী অপরাধ ছিল? আমরা গোটা বিশ্বের চোখের সামনে মরছি। কেউ গুলি খেয়ে মরছে, কেউ বাঁচার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মরছে।’

হামলার পর যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে বলে জানানো হলেও বাস্তবে গাজা আর কোথাও নিরাপদ নয়—এ বার্তা যেন নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠল। ইউনিসেফের প্রধান ক্যাথরিন রাসেল এই হামলাকে ‘সহ্য করতে না পারা হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘জীবন বাঁচাতে যে পরিবারগুলো চিকিৎসা বা খাবারের লাইনে দাঁড়ায়, তাদের ওপর হামলা কল্পনাতীত।’

দেইর আল-বালাহর আল-আকসা হাসপাতালের মর্গ আর আশপাশের এলাকা জুড়ে এখন শুধুই কান্না আর ক্ষোভ। গাজাবাসীর প্রশ্ন—কখন থামবে এই মৃত্যু মিছিল? আর কতবার লাইনে দাঁড়িয়ে বাঁচতে গিয়ে মৃত্যুকে কাছে টেনে নিতে হবে তাদের? পুরো বিশ্ব দেখছে, আর এই দৃশ্যের সামনে এখনো অবিশ্বাস আর নীরবতার দেয়ালই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত