প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নেত্রকোণায় ঢাকা-মোহনগঞ্জ রেলপথে একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনা এলাকাজুড়ে শোক ও আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করেছে। মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একই রেলপথে ঘটে যাওয়া পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও একজন তরুণ। রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নেত্রকোণা পৌর শহরের রাজুর বাজার এলাকায় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ইয়াসিন আহমেদ সায়েম নামের এক যুবক। এর আগে শনিবার সন্ধ্যার পর একই রেলপথের চল্লিশা বাজার এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারান দুই শ্রমিক। ধারাবাহিক এই দুর্ঘটনাগুলো রেলযাত্রার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
নিহত ইয়াসিন আহমেদ সায়েমের বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। তিনি নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার ধনপুর গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিনের ছেলে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জীবনের শুরুতেই নানা স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন সায়েম। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতেন তিনি। রোববার সকালে মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠেছিলেন। তবে ট্রেনটি যখন নেত্রকোণা পৌর শহরের রাজুর বাজার এলাকায় পৌঁছায়, তখনই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি।
ময়মনসিংহ রেল পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেন জানান, সায়েম ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে তিনি নিচে পড়ে যান। দ্রুতগতির ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আঘাত পান তিনি এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে রেল পুলিশ ও স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে নেত্রকোণা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। সেখানে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এই দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই একই রেলপথে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। শনিবার সন্ধ্যার পর ঢাকা-মোহনগঞ্জ রেলপথের চল্লিশা বাজার এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় দুই শ্রমিক নিহত হন। নিহতরা হলেন দিনাজপুর জেলার ছুড়িয়াপাড়া গ্রামের আকাশ রায় (২৪) এবং শেরপুর জেলার বাসিন্দা রাসেল মিয়া (২৫)। তারা দুজনই পেশায় শ্রমিক ছিলেন এবং কাজের সূত্রে নেত্রকোণায় অবস্থান করছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় আকাশ রায় ও রাসেল মিয়া রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। অসাবধানতাবশত দ্রুতগতির ট্রেনটির খুব কাছাকাছি চলে আসেন তারা। ট্রেনটি চল্লিশা বাজার এলাকায় পৌঁছানোর মুহূর্তে হঠাৎ ধাক্কা লাগে এবং দুজনই গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে নেত্রকোণা আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
একই রেলপথে অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের পরিবারে চলছে মাতম। সায়েমের বাড়িতে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় কেউ ভাবেনি, ছেলেটি আর ফিরবে না। অন্যদিকে আকাশ রায় ও রাসেল মিয়ার পরিবারও গভীর শোকে নিমজ্জিত। কর্মজীবী এই তরুণদের অকাল মৃত্যু পরিবারগুলোর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, ঢাকা-মোহনগঞ্জ রেলপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড নেই, নেই সুরক্ষিত পারাপারের ব্যবস্থা। রেললাইনের পাশে বাজার, দোকানপাট ও জনসমাগম থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে চল্লিশা বাজার ও রাজুর বাজার এলাকায় ট্রেন চলাচলের সময় লোকজনের চলাফেরা বেশি থাকলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দেখা যায় না।
রেল পুলিশের ওসি আক্তার হোসেন জানান, প্রতিটি দুর্ঘটনার বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনাগুলোর প্রাথমিক তদন্ত করা হয়েছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে মামলা নেওয়া হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” তিনি আরও জানান, যাত্রীদের ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ভ্রমণ না করার জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও অনেকেই তা মানেন না, যা মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের রেলপথে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অসচেতনতা ও অব্যবস্থাপনা। যাত্রীদের নিরাপত্তা বিধি না মানা, রেললাইনের আশপাশে অবাধ চলাচল এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এসব দুর্ঘটনাকে ডেকে আনে। একই সঙ্গে ট্রেনের অতিরিক্ত ভিড়ও একটি বড় কারণ। দরজায় দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে অনেক সময় যাত্রীরা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব দুর্ঘটনা শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং একেকটি পরিবারের জীবনে নেমে আসা চরম বিপর্যয়। অল্প বয়সে উপার্জনক্ষম মানুষদের মৃত্যু পরিবারগুলোর আর্থিক ও মানসিক ভরসা ভেঙে দেয়। সায়েম, আকাশ ও রাসেলের মতো তরুণরা ছিলেন পরিবারের আশা-ভরসার প্রতীক। তাদের আকস্মিক মৃত্যু সমাজের জন্যও এক বড় ক্ষতি।
এলাকাবাসী ও সচেতন মহল দাবি করছেন, রেল কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা প্রাচীর, সতর্ক সংকেত ও নিয়মিত টহল জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। বিশেষ করে দরজায় দাঁড়িয়ে ভ্রমণ ও রেললাইনের পাশে অসতর্কভাবে চলাফেরা থেকে বিরত থাকার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।
নেত্রকোণায় ধারাবাহিক এই ট্রেন দুর্ঘটনাগুলো আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, নিরাপত্তার প্রশ্নে সামান্য অবহেলাও কত বড় মাশুল ডেকে আনতে পারে। তিনটি তরুণ প্রাণের ঝরে যাওয়া শুধু তাদের পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক গভীর বেদনার বার্তা। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক শোকের মুখোমুখি হতে না হয়।