আমলনামার পাতায় লেখা মানুষের চিরন্তন ভবিষ্যৎ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৭ বার
আমলনামার পাতায় লেখা মানুষের চিরন্তন ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র কোরআনুল কারিম মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে নৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। মানুষের কর্ম, দায়িত্ববোধ, ন্যায়-অন্যায় ও পরকালের হিসাব—সবকিছুর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে আল্লাহর কালামে। সূরা বনি ইসরাঈলের ১৪ ও ১৫ নম্বর আয়াত মানবজীবনের সেই মৌলিক সত্যকেই গভীরভাবে তুলে ধরে, যেখানে ব্যক্তি নিজেই নিজের ভবিষ্যতের নির্মাতা এবং নিজের আমলের হিসাবদাতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা সূরা বনি ইসরাঈলের ১৪ নম্বর আয়াতে বলেন—
“তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসেব-নিকেশের জন্য যথেষ্ট।”
এই আয়াত মানুষের জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে তার নিজের আমলনামা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে লিপিবদ্ধ থাকবে তার দুনিয়ার প্রতিটি কথা, কাজ ও নিয়তের বিবরণ। কোনো ওজর, অজুহাত কিংবা অন্যের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ থাকবে না। মানুষ নিজেই হবে নিজের বিচারক।

তাফসিরকারগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহর ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এখানেই। হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর শপথ, যিনি তোমার হিসাবের ভার তোমার কাছেই অর্পণ করেছেন, তিনি অবশ্যই তোমার সঙ্গে সবচেয়ে বড় ইনসাফ করেছেন।” এই বক্তব্য মানুষের ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে। আল্লাহ কারও ওপর অন্যায় চাপিয়ে দেন না; বরং প্রত্যেককে তার নিজের কর্মের ফল ভোগ করতে দেন।

কাতাদা রহিমাহুল্লাহ তাফসিরে তাবারিতে উল্লেখ করেন, কিয়ামতের দিন সবাই তাদের আমলনামা পড়তে পারবে, এমনকি যে ব্যক্তি দুনিয়াতে নিরক্ষর ছিল সেও। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য হিসাবকে এমনভাবে সহজ করে দেবেন, যাতে কেউ অজ্ঞতার অজুহাত দিতে না পারে। এটি মানুষের জন্য যেমন সতর্কবার্তা, তেমনি ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“যে সৎপথ অবলম্বন করবে, সে নিজেরই মঙ্গলের জন্য সৎপথ অবলম্বন করে; আর যে পথভ্রষ্ট হবে, সে নিজেরই ক্ষতির জন্য পথভ্রষ্ট হবে। কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না। আর আমরা রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত শাস্তি প্রদানকারী নই।”
এই আয়াত মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিক দায়িত্বের বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট করে। এখানে আল্লাহ ঘোষণা করছেন, সৎপথে চলার ফল ভোগ করে মানুষ নিজেই এবং পথভ্রষ্টতার পরিণতিও তাকেই বহন করতে হয়।

তাফসিরে আদওয়াউল বায়ানে বলা হয়েছে, সৎ ও সত্যের পথে চলা মানে আল্লাহ, রাসূল বা সমাজ সংস্কারকদের প্রতি কোনো অনুগ্রহ করা নয়। বরং এটি মানুষের নিজেরই কল্যাণের জন্য। অনুরূপভাবে, কেউ যদি ভ্রান্ত পথে অটল থাকে, তবে সে অন্যের ক্ষতি করে না; নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনে। এটাই আল্লাহর নির্ধারিত নৈতিক নিয়ম।

এই আয়াত মানবজাতির জন্য একটি গভীর জীবনদর্শন তুলে ধরে। আল্লাহর রাসূলগণ ও সত্যের আহ্বানকারীরা মানুষের কল্যাণের জন্যই তাদের আহ্বান জানান। তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ এতে নিহিত নয়। পবিত্র কোরআনের অন্য আয়াতেও এই সত্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে—“যে সৎকাজ করে, সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে; আর কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে নিজেই ভোগ করবে। আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি মোটেই জুলুমকারী নন।” (সূরা ফুসসিলাত: ৪৬; সূরা আল-জাসিয়াহ: ১৫)

এই নীতির আলোকে মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজ একটি আমানত। ব্যক্তি তার পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের দোহাই দিয়ে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি স্বতন্ত্র নৈতিক দায় রয়েছে, যার জবাব তাকে একাই আল্লাহর সামনে দিতে হবে। কোরআন মজিদে বারবার এই সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি না বুঝলে মানুষের কার্যধারা কখনো সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে না।

তবে কোরআনের অন্য কিছু আয়াতে বলা হয়েছে, কিছু মানুষ কিয়ামতের দিন নিজের বোঝার সঙ্গে অন্যের বোঝাও বহন করবে। যেমন সূরা আল-আনকাবূতে বলা হয়েছে, তারা নিজেদের বোঝা বহন করবে এবং আরও কিছু বোঝা বহন করবে যাদের তারা বিভ্রান্ত করেছে। সূরা আন-নাহলেও বলা হয়েছে, তারা কিয়ামতের দিন নিজেদের পাপের পূর্ণ বোঝা এবং তাদেরও বোঝা বহন করবে, যাদের তারা অজ্ঞতাবশত পথভ্রষ্ট করেছে।

এই আয়াতগুলো সূরা বনি ইসরাঈলের আলোচ্য আয়াতের বিরোধী নয়। তাফসিরে ইবন কাসিরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যারা অন্যদের মন্দ কাজে আহ্বান করে, তারা আসলে সেই পাপের দায় নিজেদের ওপরই চাপিয়ে নেয়। অন্যের বোঝা তারা বহন করে না; বরং অন্যকে পথভ্রষ্ট করার কারণে যে অতিরিক্ত পাপ সৃষ্টি হয়, সেটিই তাদের নিজেদের বোঝা হয়ে যায়। এটি আল্লাহর রহমত ও ইনসাফেরই বহিঃপ্রকাশ।

আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, কোনো জাতির কাছে রাসূল প্রেরণ ও তাদের সতর্ক না করে তিনি শাস্তি দেন না। এটি আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করা হয়েছে, যাতে কেউ অজ্ঞতার অজুহাত দিতে না পারে। যারা রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সৎপথ গ্রহণ করে, তারাই প্রকৃত অর্থে সফল। আর যারা সত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তারাই শাস্তির মুখোমুখি হয়।

এই আয়াতগুলো মানবজীবনের জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার আহ্বান। প্রতিদিনের কাজ, কথাবার্তা ও সিদ্ধান্তের প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লাভের জন্য যদি মানুষ ন্যায় ও সত্য থেকে বিচ্যুত হয়, তবে পরকালে তার দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে। কোরআনের এই বাণী মানুষকে দায়িত্বশীল, সচেতন ও ন্যায়পরায়ণ জীবন গঠনের পথে আহ্বান জানায়।

সবশেষে বলা যায়, সূরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াতদ্বয় মানুষকে তার ভবিষ্যতের আয়নায় নিজের চেহারা দেখার সুযোগ দেয়। আমলনামার পাতায় লেখা থাকবে আমাদেরই সিদ্ধান্ত, আমাদেরই কর্মফল। সুতরাং আজকের জীবনই আগামীকালের হিসাবের ভিত্তি—এই উপলব্ধিই একজন মুমিনের জীবনকে আলোকিত ও সুশৃঙ্খল করে তোলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত