দরজায় কড়া নাড়ছে সংযমের মাস মাহে রমজান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৭ বার
দরজায় কড়া নাড়ছে সংযমের মাস মাহে রমজান

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আবারও আমাদের জীবনে ফিরে আসতে যাচ্ছে পবিত্র মাহে রমজান। সংযম, আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার অনন্য শিক্ষা নিয়ে আগমন করা এই মহিমান্বিত মাস মুসলমানদের জন্য এক বিশেষ অনুগ্রহ। আর মাত্র কিছুদিন পরই রমজানের পবিত্র চাঁদ উদিত হবে, আর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হবে আত্মসংযমের সাধনা, আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ।

রমজান এমন একটি মাস, যার মর্যাদা ও বিধান মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম রোজা এই মাসেই ফরজ করা হয়েছে। অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় রোজার বিধান কোরআনে যেভাবে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা এই ইবাদতের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্যে অধিকতর কল্যাণপ্রসূ, যদি তোমরা জানতে।” এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং এটি মানুষের সার্বিক কল্যাণের এক অনন্য মাধ্যম।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বহু হাদিসে উম্মতকে সুসংবাদ দিয়েছেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, যখন রমজান মাস আসে, তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। এর অর্থ হলো, এই মাসে নেক আমলের পথ সহজ হয় এবং গুনাহের পথে বাধা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ যেন বান্দাদের জন্য রহমতের দুয়ার উন্মুক্ত করে দেন, যাতে তারা সহজেই ফিরে আসতে পারে সঠিক পথে।

রমজান মূলত নফসকে সংযত করার মাস। বছরের বাকি সময়গুলোতে অধিকাংশ মানুষই নফসের চাহিদার কাছে পরাজিত হয়ে পড়ে। ভোগ-বিলাস, লোভ, রাগ, অহংকার—সবকিছু মিলিয়ে নফস মানুষের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। কিন্তু রমজান এসে সেই চিত্র বদলে দেয়। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও বৈধ চাহিদা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে একজন রোজাদার নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। এই আত্মসংযমের প্রশিক্ষণই রমজানের অন্যতম বড় শিক্ষা।

রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়।” তাকওয়া অর্থ আল্লাহভীতি, সচেতনতা ও আত্মসংযম। একজন রোজাদার যখন গোপনে থাকলেও পানাহার থেকে বিরত থাকে, তখন সে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করে। এই অনুভূতিই তাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং ন্যায় ও সততার পথে পরিচালিত করে।

রমজান শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মাস নয়; বরং এটি চরিত্র গঠনের মাস। এই মাসে মিথ্যা, প্রতারণা, গিবত, হিংসা ও সব ধরনের গুনাহ বর্জন করার বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ বর্জন করে না, তার পানাহার পরিহারের কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রোজার প্রকৃত সাফল্য কেবল উপবাসে নয়, বরং নৈতিক চরিত্রে পরিবর্তন আনার মধ্যেই নিহিত।

মাহে রমজান মানবিকতা ও সহমর্মিতারও এক অনন্য শিক্ষা দেয়। ক্ষুধার্ত থাকার মাধ্যমে একজন রোজাদার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কষ্ট অনুভব করতে শেখে। এই অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় দান-সদকা ও সহানুভূতির মানসিকতা। বিশেষ করে রোজাদারদের ইফতার করানো রমজানের এক গুরুত্বপূর্ণ আমল। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তি সহকারে ইফতার করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করাবেন, যার ফলে জান্নাতে প্রবেশের আগে সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।

এই ইফতার করানোর আমল বড় আয়োজনের ওপর নির্ভরশীল নয়। সামান্য খেজুর ও এক গ্লাস পানি দিয়েও এই মহাসওয়াব অর্জন করা সম্ভব। বিশেষ করে শহরের ব্যস্ত জীবনে, যানজট ও কর্মব্যস্ততায় আটকে পড়া মানুষদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হতে পারে অসাধারণ মানবিক উদ্যোগ। রাস্তায় অপেক্ষমাণ শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক কিংবা পথচারীদের হাতে ইফতারের সামান্য উপকরণ তুলে দিলেই একজন মুমিন পেতে পারেন অগণিত সওয়াব।

রমজান মাস কোরআন নাজিলের মাস হিসেবেও বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এই মাসেই মানবজাতির জন্য হিদায়াতের আলোকবর্তিকা হিসেবে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তাই রমজানে কোরআন তিলাওয়াত, বোঝা ও সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তারাবিহর নামাজে কোরআন শ্রবণ মুসলমানদের অন্তরকে আলোকিত করে এবং ঈমানকে আরও দৃঢ় করে।

সব মিলিয়ে মাহে রমজান আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। এই মাস আমাদের শেখায় সংযম, সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও আল্লাহভীতি। তাই আসন্ন রমজানকে যেন আমরা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মাস হিসেবে না দেখি, বরং জীবন বদলে দেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। গুনাহ থেকে তাওবা করে, নেক আমলে নিজেকে নিয়োজিত করে এবং মানুষের উপকারে এগিয়ে এসে রমজানের প্রকৃত শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করার মধ্যেই এই মাসের সার্থকতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত