প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পৃথিবীটা কারও কাছে রঙিন, আলোয় ভরা; আবার কারও কাছে নিকষ অন্ধকার, গভীর নীরবতায় মোড়া। কিন্তু আলো না থাকলেই কি পথ হারিয়ে যায় মানুষ? শব্দ না থাকলেই কি থেমে যায় স্বপ্ন? রাজধানীর দক্ষিণখানের সরদার বাড়িতে অবস্থিত মাদ্রাসাতুর রহমান আল আরাবিয়া যেন সেই প্রশ্নেরই জোরালো উত্তর। এখানে চোখের আলো নেই অনেকের, কানে শোনার ক্ষমতা নেই কারও, কিন্তু অন্তরের ভেতরে জ্বলছে ঈমানের দীপ, কোরআনের আলো। সেই আলোয় ভর করেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে এই মাদ্রাসা।
এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং মানবিকতার এক জীবন্ত নিদর্শন। অন্ধ ও বধির শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে ওঠা এই মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাংলাদেশে বিরল উদাহরণ। এখানে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতোই বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের অধীনে নিয়মিত কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নেয়। সীমাবদ্ধতা তাদের থামাতে পারেনি, বরং প্রতিকূলতাই হয়ে উঠেছে তাদের শক্তির উৎস।
ব্রেইল কোরআনের পাতায় পাতায় আঙুল বুলিয়ে হাজার হাজার আয়াত মুখস্থ করা দৃষ্টিহীন কিশোরদের দৃশ্য যে কাউকে অভিভূত করে। যাদের চোখে কখনো আলো ছিল না, তারা কোরআনের প্রতিটি শব্দ হৃদয়ে ধারণ করেছে। আবার যারা শব্দ শুনতে পায় না, তারা ইশারা ভাষার মাধ্যমে কোরআনের মর্মার্থ বোঝে, হাদিস শেখে, ফিকহ আয়ত্ত করে। নীরবতার মধ্যেও তারা শুনে ফেলে অন্তরের ডাক।
এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার সৃষ্টি হলো এক নতুন ইতিহাস। মাদ্রাসাতুর রহমান আল আরাবিয়া থেকে দুইজন অন্ধ হাফেজ কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কওমি ধারায় যেটিকে মাস্টার্স পর্যায়ের সমমান ধরা হয়, সেই স্তর পর্যন্ত পৌঁছানোই সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অর্জন। সেখানে দৃষ্টিহীন হয়ে সেই স্তর পেরোনো নিঃসন্দেহে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
এই দুই শিক্ষার্থীর জন্য অপেক্ষা করছে জীবনের পরম পাওয়া—পবিত্র উমরাহ পালন। যারা কোনোদিন দুনিয়ার আলো দেখেনি, তারা এবার ছুঁয়ে দেখবে কাবাঘরের গিলাফ। যারা শব্দ শুনতে পায় না, তারা হৃদয়ের কান দিয়ে অনুভব করবে মক্কা-মদিনার প্রশান্তি। এটি শুধু একটি ধর্মীয় সফর নয়, বরং তাদের দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায় ও আত্মত্যাগের এক অনন্য স্বীকৃতি।
মাদ্রাসার শিক্ষক ও সহপাঠীরা জানান, এই দুই শিক্ষার্থী শুরু থেকেই ছিল অত্যন্ত মনোযোগী ও পরিশ্রমী। দৃষ্টিহীনতা তাদের কাছে কখনো অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়নি। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তারা ব্রেইল কিতাবের ওপর আঙুল চালিয়ে হাদিস মুখস্থ করেছে। পরীক্ষার আগের দিনগুলোতে তাদের একাগ্রতা দেখে অনেক শিক্ষকই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মোস্তফা মঞ্জুর এই মাদ্রাসা পরিদর্শন করে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অন্ধদের জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান থাকলেও বধিরদের জন্য এমন পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁর কল্পনায় ছিল না। তাঁর ভাষায়, দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতি ব্যবহার এবং বধির শিক্ষার্থীদের জন্য সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বা ইশারা ভাষায় কোরআন ও হাদিস শিক্ষা দেওয়া বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে এক অসাধারণ উদ্যোগ। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তরিকতা থাকলে প্রতিবন্ধকতা কখনো বাধা হতে পারে না।
মাদ্রাসাতুর রহমান আল আরাবিয়ার মুহতামিম বখতিয়ার হুসাইন সরদার জানান, বর্তমানে অন্ধ ও বধির শিক্ষার্থীরা একই ভবনে অবস্থান করছে। তবে তাদের আবেগ, অনুভূতি ও মানসিক চাহিদা আলাদা হওয়ায় ভবিষ্যতে পৃথক আবাসিক ও একাডেমিক ভবন নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, আলাদা পরিবেশ পেলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও মানসিক বিকাশ আরও ভালোভাবে সম্ভব হবে। এজন্য তিনি সমাজের বিত্তবান ও দানশীলদের সহযোগিতা কামনা করেন।
এই মাদ্রাসার প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ যেন নীরবে বলে দেয় এক সাহসী গল্প। যে গল্পে আছে অন্ধকার ভেদ করে আলোর সন্ধান, নীরবতার ভেতর থেকে জেগে ওঠা দৃঢ় প্রত্যয়। এখানকার শিক্ষার্থীরা কেবল হাফেজ বা আলেম হচ্ছেন না, তারা হয়ে উঠছেন আত্মবিশ্বাসী মানুষ, যারা নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপ দিতে শিখেছেন।
সমাজে প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে এখনো নানা ভুল ধারণা ও অবহেলা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের করুণা বা বোঝা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মাদ্রাসাতুর রহমান আল আরাবিয়া চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সুযোগ পেলে অন্ধ কিংবা বধিররাও হতে পারে জাতির গর্ব, সমাজের সম্পদ। আজ তারা কোরআনের হাফেজ, হাদিসের আলেম। আগামী দিনে তারা হতে পারে পথপ্রদর্শক, দাঈ, কিংবা শিক্ষক।
এই দুই অন্ধ হাফেজের উমরাহ পালনের সুযোগ পাওয়া তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি একটি বার্তা। বার্তাটি হলো—মানুষের সম্ভাবনাকে কখনো তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা দিয়ে বিচার করা যায় না। অন্তরের শক্তি আর সঠিক সহায়তা পেলে যে কেউ অন্ধকার ভেঙে আলোর পথে এগোতে পারে।
মাদ্রাসাতুর রহমান আল আরাবিয়ার এই আঙিনা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে মানবতার সুবাস। এখানে প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে অনুপ্রেরণার গল্প। সমাজ যদি এই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়, তাদের প্রতি একটু মমতা আর সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে এই অবহেলিত মানুষগুলোই একদিন হবে আমাদের সবচেয়ে বড় গর্ব।
এই দুই বীর শিক্ষার্থীর জন্য রইল অফুরন্ত শুভকামনা। আল্লাহ যেন তাঁদের ইলমে বরকত দান করেন এবং তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে আরও বহু মানুষের জন্য আলোর দিশারি।