কিয়ামত-পূর্ব সমাজচিত্র: হাদিসে ভবিষ্যতের আয়না

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১০০ বার
কিয়ামত-পূর্ব সমাজচিত্র: হাদিসে ভবিষ্যতের আয়না

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসলাম কেবল আখিরাতমুখী কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসব্যবস্থা নয়; বরং এটি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহর রাসুল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদিসে শুধু ইবাদত ও আচার-অনুশীলনের নির্দেশনাই দেননি, বরং ভবিষ্যৎ সমাজের নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক অবস্থার বিষয়েও উম্মতকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেছেন। তাঁর বাণীগুলো আজও সময়ের সীমানা অতিক্রম করে মানুষের সামনে সতর্কবার্তা হয়ে হাজির হয়। বিশেষ করে কিয়ামতের পূর্ববর্তী সময়ের সমাজচিত্র নিয়ে বর্ণিত হাদিসগুলো বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়, যা চিন্তাশীল মানুষকে গভীর আত্মসমালোচনার দিকে আহ্বান করে।

আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের পূর্ববর্তী সমাজের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, কিয়ামত কায়েম হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে না, ভূমিকম্প বৃদ্ধি পাবে না, সময় সংকুচিত হবে না, ফিতনা প্রকাশ পাবে না, হারজ তথা খুন-খারাবি বেড়ে যাবে না এবং মানুষের মাঝে ধন-সম্পদ এমনভাবে বৃদ্ধি পাবে যে তা উপচে পড়বে। এই হাদিসটি বুখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে এবং এটি ইসলামী চিন্তাবিদদের কাছে কিয়ামতের বড় আলামতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

এই হাদিসে প্রথম যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো ইলম উঠিয়ে নেওয়া। এখানে ইলম উঠে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, কোরআন বা হাদিসের গ্রন্থগুলো পৃথিবী থেকে হঠাৎ হারিয়ে যাবে। বরং প্রকৃত দ্বিনি জ্ঞান বহনকারী আলেমদের ইন্তেকালের মাধ্যমে সমাজ থেকে সহিহ ও আমলযোগ্য ইলম ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তখন জ্ঞান থাকলেও তা হবে খণ্ডিত, বিকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মানুষ নিজের অজ্ঞতা সত্ত্বেও ফতোয়া দেবে, নেতৃত্ব দেবে এবং সমাজকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেবে। এর ফলে হক ও বাতিলের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাবে এবং গোমরাহি ব্যাপক আকার ধারণ করবে। আজকের বিশ্বে তথ্যের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও সত্যিকারের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভাব অনেক ক্ষেত্রেই এই বাস্তবতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

হাদিসে দ্বিতীয় যে আলামতের কথা বলা হয়েছে, তা হলো ভূমিকম্পের আধিক্য। ভূমিকম্প শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা। যখন মানুষ জুলুম, অবিচার, গুনাহ ও নাফরমানিতে সীমা অতিক্রম করে, তখন এ ধরনের বিপর্যয় মানুষকে আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় বড় সভ্যতার পতনের আগে নৈতিক অবক্ষয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ একসঙ্গে হাজির হয়েছে। বর্তমান যুগে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় এই হাদিসের তাৎপর্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

সময় সংকুচিত হয়ে আসার বিষয়টি হাদিসের আরেকটি গভীর দিক। এর অর্থ এই নয় যে, দিনের ঘণ্টা বা মিনিট কমে যাবে, বরং সময়ের বরকত উঠে যাবে। মানুষ অনুভব করবে যে, দিন, মাস ও বছর খুব দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। প্রচুর ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও কাজের ফলপ্রসূতা কমে যাবে। মানুষ অনেক কিছু করতে চাইবে, কিন্তু সময় যেন কিছুতেই ধরাছোঁয়ার মধ্যে আসবে না। আধুনিক জীবনের দ্রুতগতি, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ততা এবং মানসিক অস্থিরতা এই বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।

ফিতনার প্রকাশ কিয়ামত-পূর্ব সমাজের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিতনা শুধু ধর্মীয় বিভ্রান্তি নয়; এটি আকিদা, চরিত্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়, অন্যায় নানা মোড়কে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ তখন সুবিধা অনুযায়ী সত্যকে ব্যাখ্যা করে এবং আত্মস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। এই পরিস্থিতিতে ঈমান ও নৈতিকতা রক্ষা করা এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়।

হারজ বা খুন-খারাবির বৃদ্ধির কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। হারজ অর্থ নির্বিচার হত্যা ও রক্তপাত, যেখানে মানুষ কেন কাউকে হত্যা করছে, নিজেরাও তা স্পষ্টভাবে জানবে না। মানবজীবনের মূল্য তুচ্ছ হয়ে যাবে এবং সামান্য কারণেই বড় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সন্ত্রাস, সামাজিক সহিংসতা ও অপরাধের পরিসংখ্যান এই হাদিসের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে অনেকের কাছে প্রতীয়মান হয়।

হাদিসের শেষ অংশে ধন-সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। সম্পদ বাড়বে, অর্থনৈতিক সুযোগ বিস্তৃত হবে, কিন্তু তাতে প্রকৃত শান্তি ও তৃপ্তি থাকবে না। মানুষ বাহ্যিকভাবে ধনী হলেও অন্তরে নিরাপত্তাহীনতা ও অশান্তি বিরাজ করবে। যাকাত ও সদকা দেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, অথচ সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বিদ্যমান থাকবে। এই চিত্রটি আধুনিক ভোগবাদী সমাজের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।

সব মিলিয়ে এই হাদিস কেবল কিয়ামতের আলামত বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার আয়না। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইলমের মর্যাদা রক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখা, ফিতনা থেকে বাঁচা এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসাই হলো নিরাপদ পথ। কিয়ামতের সময় নির্ধারণ করা আমাদের দায়িত্ব নয়; বরং নিজের জীবন ও সমাজকে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সংশোধন করাই আমাদের মূল কর্তব্য। এই হাদিস সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে আমাদের সামনে তুলে ধরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত