প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ | নিজস্ব প্রতিবেদক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য এবং হৃদয়স্পর্শী আয়োজন—ড্রোন শো। এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রদর্শনীর মাধ্যমে স্মরণ করা হয় ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের সাহসী ও নেতৃত্বদানের অবদান। শতাধিক ড্রোনের মাধ্যমে আকাশজুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয় নারীর শক্তি, সংগ্রাম এবং বীরত্বের প্রতীক। এই আয়োজন যেন এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে আকাশ নিজেই বর্ণনা করে গেল এক বিস্ময়কর প্রতিরোধের গল্প।
সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুরু হওয়া এ ড্রোন শো প্রত্যক্ষ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগের কয়েক সহস্র নারী শিক্ষার্থীসহ সাধারণ দর্শনার্থীরা। তারা আবেগাপ্লুত হয়ে দেখেছেন ২০২৪ সালের সেই প্রতিরোধের মুহূর্তগুলো, যেগুলো নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি জাতিগত জাগরণের জন্ম দিয়েছিল। আলো দিয়ে তৈরি নানা প্রতীক—উত্তোলিত মুষ্টি, নারীর মুখচ্ছবি, প্রতিবাদের প্রতীকী চিত্র ও জাতীয় পতাকার বিমূর্ত রূপ—শুধু শৈল্পিক সৌন্দর্যই নয়, হয়ে উঠেছিল এক গভীর বার্তা বহনকারী মাধ্যম।
এই ড্রোন শো ঘিরে শহীদ মিনার এলাকা হয়ে উঠেছিল ইতিহাস ও আবেগের মিলনমঞ্চ। ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ উপলক্ষে রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু করে টিএসসি ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণা। সেই সন্ধ্যা একদিকে ছিল উৎসবমুখর, অন্যদিকে ছিল গভীর স্মরণ ও শ্রদ্ধায় পূর্ণ। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, এমন আয়োজন কেবল প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়, বরং এটি ছিল সংগ্রামী নারীদের প্রতি এক নিরব কিন্তু গভীর কৃতজ্ঞতা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই ড্রোন শো-এর মূল লক্ষ্য ছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নারীদের অসামান্য সাহসিকতা ও নেতৃত্বকে স্মরণ করা এবং বর্তমান প্রজন্মকে সেই আত্মত্যাগ ও বীরত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়া। ওই বছরের ১৪ জুলাই প্রথম প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। তাঁরা হলের তালা ভেঙে রাজপথে নামেন, প্রতিবাদের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরেন এবং শাসকগোষ্ঠীর চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেন—নির্বিচার দমন আর সহ্য করা হবে না। সেই ঘটনার রেশেই পরদিন থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অভ্যুত্থানের ঢেউ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, এই ড্রোন শো ছিল তাদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। কেউ কেউ বলেন, ‘‘আমরা শুধু গল্পে শুনেছি ২০২৪ সালের সেই আন্দোলনের কথা। আজকের আয়োজন আমাদের সেই গল্পের বাস্তব রূপ দেখিয়েছে, যেন নিজের চোখে ইতিহাস দেখলাম।’’
এই আয়োজন আরও একবার প্রমাণ করলো—একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে নারীর অবদান কেবল সহায়ক নয়, বরং প্রভাবশালী ও মৌলিক। ড্রোনের আলোয় আলোকিত সেই আকাশে যখন ‘সাহস’, ‘স্বাধীনতা’, ‘সমতা’ লেখা হয়, তখন যেন গোটা জাতি একত্রে উচ্চারণ করে—‘‘আমরা ভুলিনি, আমরা শ্রদ্ধা জানাই।’’
‘জুলাই উইমেন্স ডে’-তে এই ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন ভবিষ্যতেও চলবে কিনা জানতে চাইলে আয়োজক পক্ষ জানায়, এটি একটি বার্ষিক আয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ইতিহাসের এই সাহসী অধ্যায় ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায় অনুপ্রেরণার প্রদীপ হয়ে।