ভারতজুড়ে ভাষার রাজনীতি,হিন্দি চাপিয়ে দিতে মোদির নতুন কৌশল?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫
  • ৫১ বার

 

প্রকাশ: ১৫ জুলাই | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ভারতের রাজনীতিতে ভাষা কোনো নতুন ইস্যু নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের দেশজুড়ে হিন্দি ভাষার প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের মতো বহু ভাষার দেশে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি এক একটি অঞ্চলের সংস্কৃতি, ইতিহাস আর আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তাই হিন্দি ভাষাকে দেশের প্রধান স্রোতে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাকে অনেকেই দেখছেন নতুন একধরনের রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী প্রকল্প হিসেবে, যা মোদির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মারাঠি ভাষার গর্ব আর নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আঘাত করার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু হলে শেষ পর্যন্ত রাজ্য সরকারকে সেই নীতি বাতিল করতে হয়। এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভাষাগত পরিচয় কতটা সংবেদনশীল এবং কত দ্রুত তা রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।

এরই মধ্যে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে হিন্দি ভাষা নিয়ে ক্ষোভের আগুন আরও স্পষ্ট। দেশটির অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষা তামিলকে আঘাত করছে—এই অভিযোগে মোদি সরকারের নতুন শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে তামিলনাড়ুর সরকার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নতুন নীতি কার্যকর না হলে রাজ্যটিকে শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না। আর এই চাপের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তামিলনাড়ুতে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে মোদি সরকারের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত, যা অনেকের চোখে ‘ভারতীয়ত্ব’ আর হিন্দুত্বকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা হিসেবে ধরা পড়ছে। সরকার সরকারি কর্মসূচির নাম, শিক্ষানীতি কিংবা উন্নয়ন পরিকল্পনায় হিন্দি শব্দ ব্যবহারকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এমনকি সরকারি নথিপত্রে ‘ইন্ডিয়া’র পরিবর্তে ‘ভারত’ নামটিও বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে—যা এসেছে প্রাচীন সংস্কৃত থেকে, হিন্দির সঙ্গে যার সরাসরি সংযোগ।

ভাষাবিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীদের মতে, কোনো একটি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ভারতের বৈচিত্র্যময় সামাজিক কাঠামোকে আঘাত করবে। ‘এক দেশ, এক ভাষা’-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টায় শিক্ষা, প্রশাসন ও স্থানীয় সংস্কৃতি—সবই চাপে পড়বে বলে মনে করেন নিরঞ্জনারাধ্য ভি পি নামের এক বিশিষ্ট গবেষক। তাঁর মতে, ভাষার বৈচিত্র্যই ভারতের শক্তি। আর সেই বৈচিত্র্য রক্ষা না করতে পারলে জাতীয় ঐক্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মহারাষ্ট্রে হিন্দি ভাষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত ঘিরে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা দুই দশক আগে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দুই প্রভাবশালী রাজনীতিককে আবারও এক করেছে। চাচাতো ভাই রাজ ঠাকরে আর উদ্ধব ঠাকরে দুজনেই এবার মারাঠি ভাষার স্বার্থে এক কণ্ঠে কথা বলছেন—এটিই প্রমাণ করছে যে ভাষা কত দ্রুত দলীয় বিভাজন অতিক্রম করে একতা গড়তে পারে।

তামিলনাড়ুর বুকে হিন্দি বিরোধী আন্দোলন নতুন নয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকেই এই রাজ্যে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা পর্যন্ত হয়েছিল। নির্মলা লক্ষ্মণ নামের এক বিশিষ্ট লেখক মনে করিয়ে দিয়েছেন, তামিলরা তাঁদের ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে যে গর্ব বুকে ধরে রাখেন, তা কখনোই সহজে ভাঙার নয়।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তারা একদিকে ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রশংসা করলেও বাস্তবে হিন্দি প্রসারের নীতিকে আড়ালে–আবডালে চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি নথিপত্র, সরকারি ওয়েবসাইট, এমনকি জাতীয় শিক্ষানীতিতে হিন্দিকে কেন্দ্র করে একধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার ইঙ্গিত স্পষ্ট। নতুন শিক্ষানীতিতে রাজ্যগুলোকে তিনটি ভাষা শেখানোর নিয়ম দেওয়া হলেও অন্তত দুটি ভাষা ভারতের হতে হবে—এমন শর্তেই তামিলনাড়ুর আপত্তি। তাঁদের যুক্তি, এই শর্ত কার্যত হিন্দিকেই জোর করে ঢুকিয়ে দিচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থায়।

যদিও হিন্দি ভারতের সর্বাধিক কথ্য ভাষা এবং সংবিধানে হিন্দি ও ইংরেজি দুটোই সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত, তবু এত বড় দেশে কোনো একক ভাষা চাপিয়ে দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত—সে প্রশ্ন আজ নতুন করে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভাষার প্রশ্নে জনগণের আবেগকে অগ্রাহ্য করলে মোদি সরকারের হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী প্রকল্প চরম প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। আর এই বিরোধিতাই প্রমাণ করছে—ভারতের শক্তি আসলে তার বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়েই নিহিত।

ভাষার লড়াই কতদূর গড়াবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে হিন্দি নিয়ে নতুন করে যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ভারতের রাজনীতিতে আগামী দিনে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত