ঢাকা-১১ তে নারীর ভোট উৎসব

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৯২ বার
ঢাকা-১১ তে নারীর ভোট উৎসব

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে রাজধানীর ঢাকা-১১ আসনে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ছিল এক ভিন্নমাত্রার আবহ। উত্তর বাড্ডা থেকে ভাটারা, মধ্য বাড্ডা থেকে নর্দ্দা—বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ভোটকেন্দ্রগুলোতে সকাল গড়াতেই তৈরি হয় দীর্ঘ লাইন। তবে সবচেয়ে চোখে পড়েছে নারী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে কেন্দ্রে এসেছেন, কেউবা প্রথমবারের মতো ভোট দিতে এসে উচ্ছ্বাস লুকোতে পারেননি।

সকালে সরেজমিন উত্তর বাড্ডা ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা, এ কে এম রহমত উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ একাধিক কেন্দ্রে দেখা যায়, ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই নারী ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কেন্দ্রের ভেতর ও বাইরে দায়িত্ব পালন করছেন। ভোটকক্ষগুলোতে নারী ভোটারদের জন্য পৃথক বুথ ও সহায়তা ডেস্ক রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আগেই নেওয়া হয়েছে।

তাসলিমা জাহান নামের এক তরুণী ভোটার বলেন, তিনি অনেক আগে ভোটার তালিকাভুক্ত হলেও কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। এবারের নির্বাচন তার জীবনের প্রথম ভোট। তিনি জানান, আগের রাত থেকেই তার মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করছিল। সকাল হতেই তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কেন্দ্রে চলে আসেন। তার ভাষায়, কেন্দ্রে এসে মনে হয়েছে যেন উৎসবের দিন। আশপাশে সবাই হাসিমুখে কথা বলছে, কেউ কারও সঙ্গে অভিমান বা বিরোধ নয়—বরং এক ধরনের নাগরিক দায়িত্ববোধ কাজ করছে।

তাসলিমা আরও বলেন, তাদের পরিবারে সাতজন ভোটার রয়েছেন। এতদিন ভোট দেওয়ার সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপ ছিল। এবারের সুযোগকে তিনি নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার মতো অনুভব করছেন। তার কথায় উঠে আসে প্রত্যাশার সুর—যারা এই সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, তাদের কথা মনে রাখবেন ভোটাররা।

মুসলিমা বেগম নামের মধ্যবয়সী আরেক ভোটার জানান, আগে ভোটের সময় এক ধরনের অজানা আতঙ্ক কাজ করত। কোথাও গোলযোগ হবে কি না, নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন কি না—এসব চিন্তা থাকত। কিন্তু এবার কেন্দ্রে এসে তিনি স্বস্তি অনুভব করছেন। তার ভাষায়, আজ ভোট দিতে এসে মনে হচ্ছে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। চারপাশে পরিচিত-অপরিচিত সবার মধ্যে আন্তরিকতা ও আনন্দ। তিনি বলেন, এমন পরিবেশেই মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঢাকা-১১ আসনের বিভিন্ন কেন্দ্রের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইনকে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি সামগ্রিক রাজনৈতিক সচেতনতার একটি ইঙ্গিত বহন করে।

ঢাকা-১১ আসনটি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২১, ২২, ২৩, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১ এবং ৪২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৮৭৭ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার তিনজন। ভোটার সংখ্যার দিক থেকে এটি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন।

এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ১১ দলীয় জোট মনোনীত জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী এম. এ. কাইয়ুম। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের মো. আরিফুর রহমান, ইসলামী আন্দোলনের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদসহ আরও আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বহুমাত্রিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে আসনটি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল।

সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি আরও বাড়তে দেখা যায়। অনেক কর্মজীবী নারী ভোটার অফিসে যাওয়ার আগে ভোট দিতে কেন্দ্রে এসেছেন। কেউ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, কেউ আবার প্রতিবেশীদের নিয়ে দলবেঁধে। একাধিক কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, নারী ভোটারদের জন্য আলাদা লাইন থাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হয়েছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সচেতনতামূলক প্রচারণাও ভূমিকা রেখেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নগর এলাকার ভোটে নারী অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ শহুরে ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং নাগরিক অধিকার সম্পর্কে প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে বেশি। ঢাকা-১১ আসনে নারী ভোটারদের সক্রিয় উপস্থিতি ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে নির্বাচনকে ঘিরে সামগ্রিক মূল্যায়ন নির্ভর করবে পুরো দিনের পরিস্থিতি, ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণার স্বচ্ছতার ওপর। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে, ঢাকা-১১ আসনে ভোটের দিনটি শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দিনটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। তাসলিমা বা মুসলিমার মতো অসংখ্য নারী ভোটার আজ নিজেদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তাদের হাসিমুখ, দীর্ঘ লাইনে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা এবং ভোটকেন্দ্রের প্রাণবন্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে রাজধানীর এই আসনে দিনটি যেন শুধুই ভোটের নয়, বরং অংশগ্রহণের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com