প্রকাশ: ১৮ জুলাই | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঈদের রেশ কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাটকের দর্শক যেন হঠাৎ করেই সরে যাচ্ছে ইউটিউব থেকে। নাটকপ্রেমী দর্শকদের আচরণ ও অনলাইন উপস্থিতির এই পরিবর্তন চোখে পড়ছে ইউটিউবের সাম্প্রতিক ট্রেন্ডিং তালিকা বিশ্লেষণে। এক সময় যেখানে ইউটিউবের শীর্ষ ৫০ ট্রেন্ডিং কনটেন্টের মধ্যে ৩০টিরও বেশি জায়গা দখল করে রাখতো বাংলা নাটক, সেখানে এখন মাত্র ৭টি নাটক টিকে আছে সেই তালিকায়।
এই নাটকগুলোর বেশিরভাগই ঈদ উপলক্ষে নির্মিত এবং প্রচারিত হয়েছে ঈদের সময়। তবে ঈদের পরপরই দর্শকসংখ্যার এই বিপর্যয় শুধুই সংখ্যার গল্প নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ট্রেন্ড বা দর্শক অভ্যাসের পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বহন করছে।
ইউটিউব ট্রেন্ডিং তালিকার শীর্ষ ১৩টি স্থান দখল করে রেখেছে রিলস ও শর্ট ভিডিও কনটেন্ট। দ্রুতগতির এবং কল্পনাশক্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া এই ক্ষুদ্র ভিডিওগুলোর জনপ্রিয়তা নাটকের মতো দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা কনটেন্টকে যেন ধীরে ধীরে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে।
১৪ নম্বরে ইউটিউব ট্রেন্ডিং তালিকায় প্রথম নাটক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে জনপ্রিয় ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট সিজন ৫’-এর দ্বিতীয় পর্ব। একদল তরুণের হাস্যরস ও জীবনসংগ্রামের এই নাটক বরাবরের মতোই দর্শকদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করলেও, পাঁচদিনে ৩৪ লাখ ভিউ পাওয়া এই পর্ব পূর্ববর্তী রেকর্ড থেকে অনেকটাই পিছিয়ে।
১৬ নম্বরে রয়েছে ‘নিয়তির খেলা’ নামের নাটকটি, যেখানে একজন নারীর কর্মসংস্থান, বেকারত্ব ও জীবনসংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। শায়লা সাথী ও রাফসান ইমতিয়াজের অভিনয়ে নির্মিত এই নাটক পরিচালনা করেছেন জামরুল রাজু।
এছাড়া ২৪ নম্বরে থাকা ‘আমার ভাঙা গাড়িতে’ নাটকটিতে নিলয় আলমগীর ও জান্নাতুল সুমাইয়া হিমির জুটির পারফর্মেন্স প্রশংসিত হয়েছে। পুরনো গাড়ি আর প্রেমিকার মন জয়ের কৌতুকময় গল্পের মধ্য দিয়ে নাটকটি কিছুটা হলেও দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
‘চলো হারিয়ে যাই’ নামের আরও একটি নাটক, যেটি জুলাইয়ের শুরুতেই ইউটিউব ট্রেন্ডিংয়ে শীর্ষস্থানে ছিল, বর্তমানে রয়েছে ৩১ নম্বরে। নাটকে উঠে এসেছে দুটি অচেনা মানুষের একসঙ্গে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প, যা পরিচালনা করেছেন হাসিব হোসাইন রাখি। তৌসিফ মাহবুব ও তানজিম সাইয়ারা তটিনীর অভিনয়ে গল্পটি দর্শকদের কাছে আবেগপূর্ণ আবেদন তৈরি করেছে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাটক ‘মাটির মেয়ে’, যা ট্রেন্ডিংয়ের ৩৭ নম্বরে রয়েছে। গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা ও নারীর সামাজিক লড়াইকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই নাটকে অভিনয় করেছেন শায়লা সাথী ও তামিম খন্দকার। আর্থিক সজীবের পরিচালনায় নাটকটি ঈদের পরে আলোচনার জন্ম দেয়।
নারীপ্রধান গল্প নিয়ে নির্মিত ‘মায়ার সংসার’ ট্রেন্ডিংয়ে আছে ৪৪ নম্বরে। অ্যাথেনা অধিকারীর শক্তিশালী অভিনয়ে ফুটে উঠেছে বিয়ের পর এক নারীর শহরে গিয়ে আত্মনিয়োগ ও আত্মত্যাগের চিত্র। নাটকটি পরিচালনা করেছেন জুয়েল হাসান।
নিলয়–হিমি জুটির আরেক নাটক ‘মাছের মানুষ’ রয়েছে ৪৬ নম্বরে। মাছ বিক্রেতা বাপ-ছেলের গল্প এবং সেই পেশার প্রতি সম্মান জানানো—এই উপজীব্য নিয়ে গড়ে ওঠা নাটকটি পরিচালনা করেছেন মহিন খান। নাটকে মাছ বিক্রেতা রুইতন খান এবং এক তরুণী ভিডিও ভ্লগারের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে কাহিনি এগিয়ে চলে।
এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সময়কালীন অবস্থা নয়; বরং ইঙ্গিত করছে নাটকের দর্শকপ্রিয়তার বিপরীতমুখী গতি সম্পর্কে। ঈদের সময় যতটা আগ্রহ ছিল, ঈদের পরপরই সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে কমে এসেছে। এর পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডিং শর্ট ভিডিও, অনলাইন সিরিজ এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কনটেন্টের আধিপত্য অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিনোদন বিশ্লেষকরা।
তবে এটিও ঠিক যে, ভালো গল্প, অভিনয় ও নির্মাণশৈলী থাকলে নাটক এখনও দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু সেই জন্য প্রয়োজন আরও মনোযোগী চিত্রনাট্য, সময়োপযোগী বার্তা এবং অভিনব উপস্থাপন। না হলে নাটকগুলো একে একে ট্রেন্ডিংয়ের বাইরে চলে যাবে, আর দর্শক নতুন প্ল্যাটফর্মে নতুন ধরনের বিনোদনের খোঁজেই এগিয়ে যাবে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই পরিবর্তনকে শুধু সংখ্যার হিসাব না দেখে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেই বিবেচনা করছে। নাটকের জন্য এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার, নতুবা হয়তো ‘রিলস’-এর মধ্যে হারিয়ে যাবে একসময়ের গৌরবময় এই মাধ্যম।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন