প্রকাশ: ১৮ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
পাকিস্তানের আলোচিত মডেল ও অভিনেত্রী হুমাইরা আসগরের মৃত্যু নিয়ে জল্পনা বাড়ছেই। মৃত্যুর অনেক মাস পর তার নিথর দেহ উদ্ধার হলেও কীভাবে, কোন প্রেক্ষাপটে এবং কেন তার মৃত্যু হয়েছিল, সে বিষয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাকিস্তানের তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখন তার মৃত্যুর আগের ২৪ ঘণ্টা ঘিরেই তদন্তের কেন্দ্রে পৌঁছেছে।
সম্প্রতি তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হুমাইরার মোবাইল ফোন এখন পাকিস্তানের সন্ত্রাস দমন বিভাগের (সিটিডি) হেফাজতে রয়েছে। ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফোনটির প্রাইভেসি লক ভেঙে আরও তথ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীদের মতে, তার শেষ দিককার মেসেজ, কল লগ ও অ্যাপ ব্যবহারের তথ্য থেকেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হতে পারে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টার দিকে করাচির ক্লিফটন এলাকায় গিয়েছিলেন হুমাইরা। সেখান থেকে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে বাসায় ফেরেন তিনি। এরপর থেকে আর তাকে বাসা থেকে বের হতে দেখা যায়নি। এই তথ্য জানিয়েছে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্ত সংস্থা।
তদন্ত কর্মকর্তারা আরও জানান, মৃত্যুর আগে হুমাইরা চরম আর্থিক সংকটে ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে কাজ না পাওয়ায় মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছিলেন। তার মোবাইলের ইনবক্সে একাধিক মেসেজ পাওয়া গেছে, যেখানে তিনি বন্ধু, পরিচিতজন এবং শিল্পজগতের বিভিন্ন ব্যক্তিকে চাকরি বা কাজের অনুরোধ জানাচ্ছিলেন। কিন্তু তার সেই বার্তাগুলোর অধিকাংশই উপেক্ষিত ছিল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন ঘুরে ফিরে আসছে—তার দেহের দুর্গন্ধ কেন এতদিন পর ধরা পড়ল? তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বিষয়টি শুরু থেকেই রহস্যময় ছিল। হুমাইরার ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ আসার অভিযোগ প্রথম আসে নভেম্বর মাসে, ভবনের দ্বিতীয় তলার বাসিন্দাদের কাছ থেকে। তারা বিষয়টি ভবনের প্রহরীকে জানালেও তখন বাড়ির মালিক গিয়ে কিছু টের পাননি। ধারণা করা হচ্ছে, ফ্ল্যাটটি বন্ধ থাকায় গন্ধ বাইরে তেমনভাবে ছড়ায়নি অথবা গন্ধটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে ঘটনাটি দীর্ঘদিন চাপা থাকে।
হুমাইরার মৃত্যুর সময় তার ব্যবহৃত পোশাক ও বাসার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, তিনি সেদিন কাপড় ধুচ্ছিলেন এবং সম্ভবত বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান। দুর্ঘটনার স্থানেই তার মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
রান্নাঘরে কোনো খাবারের চিহ্ন ছিল না, যদিও তার ফোনে একটি ফুড ডেলিভারি অ্যাপ ইনস্টল করা ছিল। তবে সেটি তখন আর কাজ করছিল না—সম্ভবত অ্যাকাউন্টে অর্থ না থাকায় বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে। এসব তথ্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে, একদিকে আর্থিক অসচ্ছলতা, অন্যদিকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সব মিলিয়ে হুমাইরার শেষ সময়গুলো ছিল একাকী, বিষণ্ন ও দুর্বিষহ।
এদিকে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য এখনও হাতে পায়নি তদন্তকারী দল। তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক তথ্য হাতে এলে হুমাইরার মৃত্যুর দিন বা তার আগের দিনগুলোতে তার আর্থিক অবস্থান ও কোনও ধরনের লেনদেন হয়েছিল কিনা—তা জানা যাবে, যা তদন্তে নতুন মোড় আনতে পারে।
চাঞ্চল্যকর এই মৃত্যুর ঘটনার পেছনে মানসিক স্বাস্থ্য, সমাজের অবহেলা ও সাংস্কৃতিক জগতে নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মানজনক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের মূলধারার সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। তদন্ত এগিয়ে চলেছে, তবে হুমাইরার নিঃসঙ্গ মৃত্যু যেন সমাজের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হিসেবেই উঠে আসছে প্রতিটি পরতে পরতে।