প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ জানিয়েছেন, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এড়িয়ে না গিয়ে খোলামেলা ও আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব, বিভিন্ন বিদেশি কূটনীতিক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
হাইকমিশনার রিয়াজ বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক শুধুমাত্র কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বাণিজ্য, নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য বণ্টনসহ পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো বাস্তবতার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। তিনি আরও জোর দেন, এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে কেউ এগিয়ে থাকবে আর কেউ পিছিয়ে থাকবে না; বরং পারস্পরিক সম্মান, ভারসাম্য ও নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি গণতন্ত্রে আস্থা, উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়াতে হবে। কঠিন বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে, সৎভাবে মোকাবিলা করাই সমাধানের পথ। হাইকমিশনারের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্ব ভারতের সঙ্গে বাস্তববাদী, সম্মাননির্ভর ও ফলপ্রসূ সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেয়। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ঢাকা চায় দিল্লিকে সঙ্গে নিয়ে এমন আঞ্চলিক পরিবেশ গড়ে তুলতে, যেখানে সহযোগিতা, বোঝাপড়া এবং সমঝোতা প্রধান ভূমিকা রাখবে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং গণহত্যার মুখেও আত্মসমর্পণ না করা মানুষের সাহসিকতার কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সহায়তা, আশ্রয় ও সমর্থনের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন। এই অঞ্চলগুলোতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাওয়া সহায়তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে, বলে তিনি বলেন।
রিয়াজ হামিদুল্লাহ আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার—প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই দেশের সংগ্রাম হয়েছিল। অপারেশন সার্চলাইটের মতো নির্মম অভিযানের স্মৃতি আজও সেই ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি যোগ করেন, ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও সাহসিকতার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন, যাতে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি সুগভীর হয়।
হাইকমিশনার রিয়াজের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠে, কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য ও কূটনৈতিক মঞ্চ নয়, বাস্তব সমস্যা, পরস্পরের স্বার্থ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো খোলামেলা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সৎ আলোচনা ছাড়া দুই দেশের মধ্যে সমতা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
এবারের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে রিয়াজের এই বক্তব্য কেবল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্দেশ্যকে তুলে ধরেনি, বরং ভারতের সঙ্গে গভীর এবং স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ার গুরুত্বকেও ফুটিয়ে তুলেছে। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা, মানবাধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
রিয়াজ হামিদুল্লাহর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও সাংবাদিক সমাজে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বর্তমান দুই দেশের সম্পর্কের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা হিসেবে দেখা হচ্ছে।