প্রকাশঃ ০১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের মাধ্যমে জাপান সামরিক সক্ষমতা জোরদার করেছে, যা চীনের নিকটবর্তী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দেশটির নিরাপত্তা কৌশলের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে ধরা হচ্ছে। মঙ্গলবার জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি ঘোষণা করেন, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কিউশু অঞ্চলের কুমামোতোতে স্থাপন করা হয়েছে। এটি মূলত পূর্ব চীন সাগরে চীনের নৌ শক্তি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নেওয়া পদক্ষেপ। তিনি বলেন, এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিহত করতে এবং জাপানি সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
জাপানের স্থল থেকে জাহাজে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা প্রায় এক হাজার কিলোমিটার, যার মাধ্যমে চীনের মূল ভূখণ্ডের কিছু এলাকা যেমন সাংহাই, কুমামোতো থেকে প্রায় ৯০০ কিলোমিটারের দূরত্বে চলে আসে। একই সঙ্গে হাইপার ভেলোসিটি গ্লাইডিং প্রজেক্টাইল শিজুওকা অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে, যা দূরবর্তী দ্বীপ এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। কোইজুমি বলেন, এই পদক্ষেপ জাপানের প্রতিরক্ষা ও জবাব দেওয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী করতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
জাপানের দীর্ঘদিনের নীতি ছিল, তাদের সামরিক বাহিনী শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হবে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় টোকিও ধীরে ধীরে তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করেছে। ২০২২ সালে জাপান পাল্টা আক্রমণ সক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা অনুমোদন করে। গত বছরের প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়, শুধুমাত্র ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে আধুনিক প্রযুক্তির হুমকি মোকাবিলা করা কঠিন।
চীনের সামরিক ক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে বিরোধ জাপানের নিরাপত্তা নীতি পুনঃমূল্যায়নের অন্যতম কারণ। চীন এই দ্বীপপুঞ্জকে দিয়াওইউ নামে দাবি করে এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। একই সঙ্গে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইঙ্গিত দেন, যদি তাইওয়ানের ওপর কোনো হামলা ঘটে, জাপান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগও সৃষ্টি হয়েছে। কুমামোতোতে স্থানীয় সম্প্রদায়কে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র আনা হলে সামরিক ঘাঁটির সামনে বিক্ষোভ দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পদক্ষেপ চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করতে পারে এবং সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে।
জাপানের প্রতিরক্ষা কৌশল শুধুমাত্র আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আধুনিক প্রযুক্তি ও দূরপাল্লার প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সমন্বয়ে গঠিত। কোইজুমি বলেন, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন বিশ্বমঞ্চেও জাপানের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি জাপানের প্রতিরক্ষা নীতি এবং চীনের সামরিক কার্যক্রমের মধ্যে একটি সতর্কতামূলক ব্যালান্স হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে এটি চীনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
জাপানের সামরিক পদক্ষেপ ও চীনের প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া অঞ্চলের সামরিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই ধরনের পদক্ষেপ কেবল জাপানের সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এশিয়া অঞ্চলের নিরাপত্তা ও শক্তি ভারসাম্যের ওপরও তা প্রভাব ফেলে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জাপানের এই পদক্ষেপ নজরে রাখছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের দেশগুলো চীনের সামরিক বৃদ্ধি ও জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সমন্বয় পর্যবেক্ষণ করছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনাও সমান্তরালভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে অঞ্চলটিতে সম্ভাব্য সংঘাত থেকে বিরত থাকা যায়।
সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনা করলে, জাপানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন কেবল প্রতিরক্ষা নীতির অংশ নয়, এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ সিদ্ধান্তের প্রভাব কেবল জাপান-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই নয়, পুরো এশিয়া অঞ্চলের কৌশলগত অবস্থান এবং সামরিক ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।