প্রকাশঃ ০১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে ইরানের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও পারস্য উপসাগরের উত্তেজনা ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক সেনাবাহিনী, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি এবং জোরালো কূটনীতি থাকা সত্ত্বেও ইরান যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে বিশ্বকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। সামরিক শক্তি এবং উন্নত অস্ত্রসজ্জা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানকে ভূপাতিত করতে পারছে না, কারণ এই অঞ্চলে কোনো সামরিক পদক্ষেপই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।
ইরান যদিও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হারাতে পারে না, তবে তারা কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এ প্রণালি বিশ্বের তেল রপ্তানির একটি প্রধান পথ, এবং এটি বন্ধ করে দিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উপর চাপে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালিতে সামান্য বাধা সৃষ্টি করেই তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব ফেলতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ কৌশল ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির হাতিয়ার। সামরিক আক্রমণ হলেও ইরান প্রতিশোধের প্রস্তুতি রাখে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক ও নীতি-নির্ধারণে নতুন সমস্যা তৈরি করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এ অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শন করলেও, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বা খারগ দ্বীপ দখল করতে হলে স্থলসেনা মোতায়েন করতে হবে। এমন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক অবস্থান আরও নড়বড়ে হয়। ইরানও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে, যা পারস্য উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
হোয়াইট হাউসের দাবি অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আলোচনার চেষ্টা করছে। তবে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি তেহরান অস্বীকার করেছে। একদিকে যুদ্ধের হুমকি, অন্যদিকে কূটনৈতিক দর-কষাকষির চাপ—এই দ্বন্দ্বই ট্রাম্পের কৌশলগত সীমাবদ্ধতার প্রমাণ দিচ্ছে। যুদ্ধের দীর্ঘায়ন ইরানের জন্য রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য কোনো নিশ্চিত বিজয় অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের সময়কাল দীর্ঘ হলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে যা তাকে সম্মানজনক নেতা হিসেবে দেখাবে না। অন্যদিকে ইরান কৌশলগতভাবে ধৈর্য ধরে রেখেছে। তারা সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম হলেও হরমুজ প্রণালি বা ক্ষুদ্র আক্রমণের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলতে সক্ষম। এ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং পরিবহণ ব্যাহত করে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে তারা সরাসরি ইরানকে ভূপাতিত করতে পারছে না। স্থলসেনা মোতায়েন করলে সংযুক্ত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক খরচ এবং জনমতের চাপ আরও বেড়ে যাবে। ইরানও সম্ভাব্য আঘাতের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম, ফলে সামরিক বিজয় রাজনৈতিকভাবে সীমিত প্রভাব রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের দীর্ঘায়ন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্থিতিশীল কূটনৈতিক সমাধান কঠিন করে তুলেছে। তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং অর্থনৈতিক চাপ ইরানের দর-কষাকষি ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। এ অবস্থায় ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খরচ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা তাকে বাধ্য করতে পারে সময়মতো কোনো চুক্তিতে সই করতে।
ইরানের কৌশল মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি, তেলক্ষেত্র এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণের ওপর কৌশলগত প্রভাব মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে সীমিত করছে। যুদ্ধের এই জটিলতা দেখাচ্ছে, যে কোনো শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং কৌশলগত সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করে সামরিক সফলতার পরিধি।
পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতা ইরানের ওপর প্রবল হলেও, হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য বড় তুরুপের তাস হিসেবে কাজ করছে। যুদ্ধের দীর্ঘায়ন, বিশ্ববাজারে প্রভাব এবং রাজনৈতিক চাপ মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করা কঠিন করে তুলেছে। এ পরিস্থিতি ইরানকে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষিতে শক্ত অবস্থানে রেখেছে, যেখানে তারা সীমিত সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম।