প্রকাশঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব রাজনীতির ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাশিয়া ও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সম্পর্ক। রাশিয়ার পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, উত্তর আটলান্টিক জোট ন্যাটো সরাসরি সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন দাবি করেছেন রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রুশ বার্তা সংস্থা তাসের বরাত দিয়ে জানা গেছে, জাখারোভা সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে বলেন, ন্যাটোর সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, ধারাবাহিক মহড়া এবং কৌশলগত অবস্থান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে জোটটি ভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং পরিসংখ্যান ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলেই এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাশিয়ার এই অভিযোগের পেছনে রয়েছে ন্যাটোর সাম্প্রতিক কার্যক্রম প্রতিবেদন, যেখানে ২০২৫ সালের সম্ভাব্য সামরিক ব্যয়ের একটি বিশদ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জাখারোভা দাবি করেন, এই ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ। তার মতে, ৩২টি সদস্য দেশের এই বিপুল ব্যয় শুধুমাত্র প্রতিরক্ষার জন্য নয়, বরং একটি বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি ন্যাটোর উদ্দেশ্য কেবল প্রতিরক্ষা হয়, তবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা কোথায়। তার ভাষায়, এই ব্যয়ই প্রমাণ করে যে জোটটি ভবিষ্যতের সংঘাতকে সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুত করছে।
রাশিয়ার অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ন্যাটোর সামরিক মহড়ার সংখ্যা ও ধরন। জাখারোভা জানান, গত বছরে ন্যাটোর অধীনে ১২০টিরও বেশি সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর বাইরে সদস্য দেশগুলো নিজেদের উদ্যোগে আরও ৭০০টির বেশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এসব মহড়ায় অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা বাড়ছে এবং অংশীদার দেশগুলোর সম্পৃক্ততাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তার দাবি, এসব মহড়ায় শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং আক্রমণাত্মক কৌশলও অনুশীলন করা হচ্ছে। এতে ন্যাটোর সামরিক মনোভাবের একটি ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠছে, যা রাশিয়ার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ন্যাটোর এই কর্মকাণ্ডকে ‘আগ্রাসী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
একই সঙ্গে ন্যাটোর পক্ষ থেকে রাশিয়াকে ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলের প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করেছেন জাখারোভা। তিনি বলেন, এই ধরনের বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ানোর একটি কৌশল মাত্র।
রাশিয়ার এই অভিযোগ নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব বেড়েছে। ইউক্রেন ইস্যু, পূর্ব ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে মতবিরোধ—এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া ও ন্যাটোর সম্পর্ককে উত্তেজনাপূর্ণ করে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবার হামলা, আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং নাশকতার মতো অভিযোগ-প্রতিযোগিতা, যা দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
জাখারোভা ন্যাটোর এসব অভিযোগকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনা অনেক অভিযোগই প্রমাণহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার মতে, এসব অভিযোগের মাধ্যমে ন্যাটো নিজেদের সামরিক প্রস্তুতির যৌক্তিকতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে ন্যাটো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়া সেটিকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এবং উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
এই উত্তেজনার প্রভাব শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনই হতে পারে উত্তেজনা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তবে বাস্তবতা হলো, উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ন্যাটোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার এই নতুন অভিযোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরেকটি উত্তপ্ত অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। সামরিক প্রস্তুতি, পারস্পরিক সন্দেহ এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা—এসব বিষয় মিলিয়ে বিশ্ব আবারও এক অনিশ্চিত সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই উত্তেজনা কূটনৈতিক পথে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় কিনা, নাকি এটি আরও বড় সংঘাতের দিকে গড়ায়।