প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম নগরীতে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই শ্রমিক। চট্টগ্রাম ওয়াসা-এর স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জন্য মাটি খননের সময় আকস্মিকভাবে মাটি ধসে পড়ে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এতে আরও দুই শ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ভোর ৪টার দিকে নগরীর আগ্রাবাদ এক্সেস রোড এলাকার সিঙ্গাপুর মার্কেটের সামনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। রাতের নিস্তব্ধতায় চলমান কাজের মধ্যেই হঠাৎ মাটি ধসে পড়ে শ্রমিকরা চাপা পড়েন, যা মুহূর্তেই ঘটনাস্থলকে শোকাবহ দৃশ্যে পরিণত করে।
নিহত দুই শ্রমিকের মধ্যে একজনের নাম রাকিব এবং অন্যজন তুষার। তাদের মধ্যে তুষারের বাড়ি দিনাজপুর জেলায়। তবে নিহতদের পূর্ণ পরিচয় এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। আহত দুই শ্রমিক সাগর ও এরশাদকে দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা বর্তমানে হাসপাতালের ক্যাজুয়াল্টি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন।
ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন জানান, স্যুয়ারেজ পাইপ বসানোর জন্য গভীর গর্ত খননের কাজ চলছিল। সেই সময় হঠাৎ করে চার শ্রমিক মাটি চাপা পড়েন। দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই নুরুল আলম জানান, আহত অবস্থায় চারজন শ্রমিককে হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুইজনকে মৃত ঘোষণা করেন। বাকি দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সহকর্মী শ্রমিকরা জানান, গভীর রাতে কাজ চলছিল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তাদের মধ্যে কিছুটা শঙ্কাও ছিল। তবে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে থাকা চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, এই স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ করছে একটি চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন। তিনি বলেন, এটি একটি ট্রায়াল পিটের কাজ ছিল, যা গভীর রাতে করা হচ্ছিল। হঠাৎ মাটি ধসে পড়ার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, নগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই গভীর খনন কাজের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম, সুরক্ষা দেয়াল বা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দুর্ঘটনাও সেই নিরাপত্তা ঘাটতির একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত নগরায়নের কারণে চট্টগ্রামে একাধিক বড় অবকাঠামো প্রকল্প চলমান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে এমন দুর্ঘটনা আরও ঘটতে পারে। বিশেষ করে রাতের বেলায় কাজের সময় অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হয়, যা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়ে।
মানবিক দিক থেকে এই দুর্ঘটনা গভীর শোকের। দুই তরুণ শ্রমিকের অকালে মৃত্যু তাদের পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা অপূরণীয়। আহতদের সুস্থতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। অনেকেই মনে করছেন, এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে কঠোর নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং নিয়মিত তদারকি বাড়ানো জরুরি।
অন্যদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহরের উন্নয়নের জন্য এসব বড় প্রকল্প অপরিহার্য হলেও শ্রমিকদের জীবন সুরক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের ভূমিকা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কাজের পদ্ধতি খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে কোনো অবহেলা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রামের এই দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—উন্নয়ন প্রকল্পের গতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শ্রমিক নিরাপত্তাও সমানভাবে জরুরি। এখন দেখার বিষয়, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।