প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ জন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আগামী ৫ মে আদেশ দেবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, যা মামলার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মামলাটি মূলত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় সংঘটিত সহিংস ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে কিশোর, শিক্ষার্থী, পোশাককর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন, যা ঘটনাটিকে আরও মর্মান্তিক ও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
আদালতে এদিন আসামিদের পক্ষে ডিসচার্জ বা অব্যাহতির আবেদন শুনানি করেন আইনজীবী মো. আলী হায়দার, শেখ মুস্তাভী হাসান এবং আমির হোসেন। যেহেতু আসামিরা পলাতক, তাই রাষ্ট্রের খরচে তাদের পক্ষে এই আইনজীবীরা নিয়োগ পেয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। শুনানিতে তারা দাবি করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই মামলায় আসামিদের জড়ানো হয়েছে এবং প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে কোনো সুস্পষ্ট অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি।
বিশেষ করে তারা উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে এই মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া উচিত বলে তারা আদালতের কাছে আবেদন জানান। তবে এই যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে প্রসিকিউশন।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ডিসচার্জ আবেদনে মামলার বিষয়বস্তুকে খাটো করে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং মামলার মূল কাঠামোর বাইরে গিয়ে বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম আদালতে বলেন, আবেদনটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘কথিত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মামলার গুরুত্বকে খর্ব করার চেষ্টা। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু আইনজীবীর সঙ্গে আসামিদের যোগসাজশ থাকতে পারে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা তৈরি করছে।
উভয় পক্ষের যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি শুনে ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য আগামী ৫ মে দিন নির্ধারণ করেন। এই দিন আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হবে কিনা, যা মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই মামলায় শামীম ওসমান ছাড়াও আরও ১১ জন আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন তার ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, আত্মীয়স্বজন এবং স্থানীয় রাজনীতি ও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মামলাটি শুরু থেকেই আলোচনায় রয়েছে, কারণ এতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম জড়িত।
প্রসিকিউশনের দাখিল করা অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাড়া ও ফতুল্লা এলাকায় সহিংস ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হন। এর মধ্যে ছিলেন কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল এবং ছয় বছরের শিশু রিয়া। এই ঘটনাগুলো দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করে।
পরবর্তী সময়ে ২১ জুলাই এবং ৫ আগস্ট আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা এই মামলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মোট তিনটি অভিযোগে ১২ আসামির বিরুদ্ধে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গ্রহণ করে এবং আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের মামলার বিচার একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এখানে প্রমাণ উপস্থাপন, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং আইনি বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে অভিযোগ গঠনের পর্যায়টি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই মামলাটি শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এতে দেশের একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। ফলে মামলার অগ্রগতি ঘিরে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও কৌতূহল ও উত্তেজনা রয়েছে।
এদিকে নিহতদের পরিবার এখনো ন্যায়বিচারের আশায় অপেক্ষা করছেন। তাদের দাবি, যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তারা মনে করেন, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হবে, যা তাদের জন্য আরও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
সব মিলিয়ে, আগামী ৫ মে নির্ধারিত আদেশ এই মামলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে মামলাটি পরবর্তী ধাপে কীভাবে এগোবে এবং বিচার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত অগ্রসর হবে। দেশের বিচারব্যবস্থা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে এই মামলার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।