চট্টগ্রামে অফডক চার্জ বাড়ায় খরচ বাড়বে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার
চট্টগ্রামে অফডক চার্জ বাড়ায় খরচ বাড়বে

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব এবার পড়েছে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক বেসরকারি অফডক বা ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোগুলোতে। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অফডকগুলোর হ্যান্ডলিং ও পরিবহন চার্জ প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যা ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই বাড়তি চার্জের কারণে বছরে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১০০ কোটি টাকারও বেশি, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।

চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে এবং আমদানি-রফতানি কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে অফডকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূল বন্দরের বাইরে অবস্থিত এসব বিশেষায়িত কন্টেইনার ডিপোতে আমদানিকৃত পণ্য খালাস, লোডিং-আনলোডিং, সংরক্ষণ এবং শুল্কায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়। বর্তমানে ২১টি অফডক বছরে প্রায় ৩ লাখের বেশি আমদানি কন্টেইনার এবং সাড়ে ৭ লাখের বেশি রফতানি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করছে। ফলে এই খাতে যে কোনো ধরনের খরচ বৃদ্ধি সরাসরি বাণিজ্যের সামগ্রিক ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।

জানা গেছে, গত ১৮ এপ্রিল দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরপরই অফডকগুলোর পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশ্ববাজারে তেলের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল অফডকগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রমে এই মূল্যবৃদ্ধি তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি করে। কারণ অফডক থেকে বন্দরে কন্টেইনার পরিবহনে ব্যবহৃত লরি থেকে শুরু করে ডিপোর ভেতরে কন্টেইনার ওঠানামার কাজে ব্যবহৃত ক্রেন ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি—সবই ডিজেলচালিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২১টি অফডকে প্রতিদিন গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। ফলে প্রতি লিটারে মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি তাদের অপারেশনাল খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চার্জ সমন্বয় ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

Bangladesh Inland Container Depot Association-এর মহাসচিব রুহুল আমিন বিপ্লব বলেন, ডিপোগুলোর প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল ব্যবহার করতে হয়। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে তাদের ব্যয়ও বেড়েছে, যা সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েই চার্জ বাড়ানো হয়েছে। তার মতে, এটি ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি অনিবার্য ছিল।

তবে ব্যবসায়ী মহল এই যুক্তিকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছে না। তাদের অভিযোগ, গত কয়েক মাসে একাধিকবার চার্জ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্প খাতে এই অতিরিক্ত ব্যয় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।

Bangladesh Freight Forwarders Association-এর সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, সম্প্রতি অফডকগুলোর ট্যারিফ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। তার ওপর আবার নতুন করে সাড়ে ৮ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা বাণিজ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তার মতে, এই ধরণের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের জন্য টেকসই নয় এবং এতে দেশের রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, চার্জ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা বা নিয়ন্ত্রণ নেই বলে মনে হচ্ছে। যার যার মতো করে চার্জ বাড়ানো হচ্ছে, যার পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে ব্যবহারকারীদের ওপর। এটি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অফডক চার্জ বৃদ্ধি একটি চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করে। প্রথমে এটি পরিবহন খরচ বাড়ায়, এরপর তা পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ে প্রভাব ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়।

এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ প্রতিযোগী দেশগুলো তুলনামূলক কম খরচে পণ্য সরবরাহ করতে পারলে বাংলাদেশের রফতানি আদেশ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মতো সংবেদনশীল খাতে এর প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।

ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে সরকারের সক্রিয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তারা চার্জ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করা যায় এবং একই সঙ্গে খাতটির স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অফডক ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই খাতে যে কোনো ধরনের অস্থিরতা পুরো অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন অফডক পরিচালনাকারীদের ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপও বেড়েছে—এই দ্বৈত সংকটের সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।

সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু একটি খাতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। অফডক চার্জ বৃদ্ধি তারই একটি প্রতিফলন, যা ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে দেশের বাণিজ্যিক প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা যায় এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত