ছিনতাইকারীদের নির্মমতায় প্রাণ গেল বুলেট বৈরাগীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
ছিনতাইকারীদের নির্মমতায় প্রাণ গেল বুলেট বৈরাগীর

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ডের রহস্য অবশেষে উদ্‌ঘাটন করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। প্রথমদিকে ‘ক্লুলেস’ হিসেবে বিবেচিত এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ছিনতাইয়ের অংশ, যেখানে যাত্রী সেজে ফাঁদ পেতে একদল পেশাদার ছিনতাইকারী তার জীবন কেড়ে নেয়। ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব, যারা সবাই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

সোমবার কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ছিনতাইকারীরা পরিকল্পিতভাবে বুলেট বৈরাগীকে টার্গেট করে এবং সুযোগ বুঝে তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেয়। এরপর চলন্ত অবস্থায় তাকে মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়। এতে গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

গ্রেফতারকৃতদের পরিচয় প্রকাশ করে র‍্যাব জানায়, তারা সবাই কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার বাসিন্দা। তাদের নাম মো. সোহাগ, ইসমাইল হোসেন জনি, ইমরান হোসেন হৃদয়, রাহাত হোসেন জুয়েল এবং সুজন। রোববার রাতে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তদন্তে জানা গেছে, তারা একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য, যারা নিয়মিতভাবে যাত্রী সেজে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করত।

ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে র‍্যাব জানায়, গত ২৪ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন বুলেট বৈরাগী। তিনি বাস থেকে নেমে জাগরঝুলি এলাকায় পৌঁছানোর পরই ছিনতাইকারীদের নজরে পড়েন। ওই সময় ওত পেতে থাকা চক্রটি তাকে তাদের টার্গেট হিসেবে বেছে নেয়। এরপর কৌশলে তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেয়।

চলন্ত অটোরিকশার ভেতরেই শুরু হয় নির্যাতন। তাকে মারধর করে মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে একপর্যায়ে তাকে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়। এতে মাথায় মারাত্মক আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর, ২৫ এপ্রিল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশ।

মরদেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়, যা থেকে স্পষ্ট হয় এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ঘটনার পরপরই নিহতের মা বাদী হয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড তদন্তে পুলিশ, ডিবি, সিআইডি ও পিবিআইয়ের পাশাপাশি র‍্যাবও কাজ শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পরে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

বুলেট বৈরাগীর পরিচয় তুলে ধরে র‍্যাব জানায়, তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতেই এমন মর্মান্তিক পরিণতি তার সহকর্মী ও পরিবারের জন্য গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সহকর্মীরা জানিয়েছেন, বুলেট বৈরাগী ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় ক্ষতি। তার সহকর্মীরা এই ঘটনার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সড়কপথে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় একা যাতায়াত করা এখন অনেকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন, যাতে এ ধরনের অপরাধ দমন করা যায়।

র‍্যাব জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই চক্রের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই হত্যাকাণ্ড আবারও প্রমাণ করেছে, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো কতটা সংগঠিত ও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নও তুলেছে। সাধারণ মানুষ এখন নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা চায়।

সব মিলিয়ে, কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা—যেখানে নিরাপত্তা, সচেতনতা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত