প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম রোগের প্রকোপ, যা বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, করোনাভাইরাসের তুলনায় হাম ৬ থেকে ৮ গুণ বেশি সংক্রামক, ফলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত শিশু ভর্তি হচ্ছে, যা অভিভাবকদের মধ্যে বাড়িয়ে তুলছে আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তা।
রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। অনেক শিশুই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে, তবে এখনো প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছে অসংখ্য শিশু। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে, যা চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে খুব সহজেই একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুর কাশি, হাঁচি বা সংস্পর্শের মাধ্যমেই এই ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়। ফলে একটি শিশু আক্রান্ত হলে আশপাশের অনেক শিশুর মধ্যেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
মহাখালী ডেডিকেটেড হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার জানান, “করোনাভাইরাসের তুলনায় হাম অনেক বেশি সংক্রামক। এটি ৬ থেকে ৮ গুণ বেশি দ্রুত ছড়ায়। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।” তিনি আরও বলেন, অনেক সময় মায়ের শরীরে যদি হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকে, তাহলে সেই ইমিউনিটি শিশুর শরীরেও তৈরি হয় না। ফলে জন্মের পরপরই শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
হাসপাতালে ভর্তি থাকা অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা ঠিকমতো খেতে পারছে না, চোখে ও মুখে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা যাচ্ছে এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। এসব লক্ষণ অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানের পাশে দিন-রাত কাটাচ্ছেন, দ্রুত সুস্থতার আশায়।
চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, অপুষ্টি এই রোগের জটিলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের ক্ষেত্রে হাম আরও মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এতে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের টিকা দেওয়া হলে এই রোগ অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশু নির্ধারিত সময়মতো টিকা পাচ্ছে না বা টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করতে এবং কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে। তারা বলছেন, প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু করা গেলে জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এছাড়া আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সুষম খাদ্য গ্রহণ জরুরি।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মহামারির সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে চাপের মুখে পড়েছিল, তার পর এখন হাম রোগের এই নতুন করে বিস্তার আবারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও হাম দীর্ঘদিন ধরেই একটি পরিচিত রোগ, তবে এর উচ্চ সংক্রমণ ক্ষমতা এবং শিশুদের ওপর মারাত্মক প্রভাব এটিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে এই রোগের বিস্তার দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
অভিভাবকদের সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, হামকে অবহেলা করার সুযোগ নেই, কারণ এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, দেশে হাম রোগের এই বাড়তে থাকা সংক্রমণ একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে এটি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে শিশুদের এই ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা যায়।