প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিরাজগঞ্জের Ullapara Upazila-তে হঠাৎ করে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড় যেন মুহূর্তের মধ্যেই বদলে দিয়েছে মানুষের জীবনচিত্র। মাত্র দেড় মিনিটের সেই তাণ্ডবেই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে একাধিক ইউনিয়নের ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ক্ষেত। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির এই দীর্ঘ তালিকার মাঝেও সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি হলো এক অসহায় নারীর মৃত্যু, যিনি নিজের ভাঙাচোরা ঘরের ভেতরেই জীবন হারিয়েছেন।
সোমবার ভোরে ফজরের নামাজের পরপরই শুরু হয় ঝড়ের তাণ্ডব। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে হালকা বাতাস বইতে শুরু করলেও মুহূর্তের মধ্যেই তা রূপ নেয় ভয়াবহ ঝড়ে। চোখের পলকে চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে, বাতাসের গতি বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে, আর সেই সঙ্গে শুরু হয় গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ। মাত্র দেড় মিনিট স্থায়ী হলেও এই ঝড়ের শক্তি ছিল এতটাই প্রবল যে পুরো এলাকার মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঝড়টি উপজেলার কয়ড়া, বাঙ্গালা, সলঙ্গা, রামকৃষ্ণপুর, পূর্ণিমাগাঁতী ও বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। এসব এলাকায় অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও ঘরের চাল উড়ে গেছে, কোথাও আবার গাছ ভেঙে পড়ে পুরো ঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি ও তারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে।
এই ঝড়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক শিকার হন নাছিমা খাতুন, বয়স ৪৫। তিনি দুর্গানগর ইউনিয়নের বালসাবাড়ি পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। স্বামী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে সরকারি খাস জমিতে ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতেন তিনি। তাদের সংসার ছিল খুবই সীমিত আয়ের, যেখানে প্রতিদিনের জীবনযাপনই ছিল এক ধরনের সংগ্রাম।
ঘটনার সময় নাছিমা খাতুন ঘরের ভেতরে ছিলেন। হঠাৎ করেই একটি বড় গাছ ঝড়ে ভেঙে পড়ে তার ঘরের ওপর। মুহূর্তের মধ্যেই চাপা পড়ে যান তিনি। স্থানীয়রা ছুটে এসে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও ততক্ষণে সব শেষ। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, সেই সময় ঘরের ভেতরেই থাকা তার দুই শিশু সন্তান অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যায়। তবে মায়ের এমন মৃত্যু তাদের জীবনে যে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
উল্লাপাড়া থানার উপপরিদর্শক সারোয়ার হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। মরদেহ উদ্ধার করে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটি একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা, যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একটি প্রাণ ঝরে গেছে।
ঝড়ের প্রভাব শুধু একটি পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, স্বল্প সময়ের এই ঝড়ে বিভিন্ন স্থানে ধানগাছ মাটিতে নুয়ে পড়েছে, ফলে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। Sirajganj District-এর এই অঞ্চলটি মূলত কৃষিনির্ভর হওয়ায় ফসলের ক্ষতি মানে অনেক পরিবারের আর্থিক সংকট আরও গভীর হওয়া।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমি বলেন, ঝড়টি খুব অল্প সময়ের হলেও এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। তিনি জানান, অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি ইউনিয়নে অসংখ্য গাছপালা ভেঙে পড়েছে এবং আবাদি জমির ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এমন আকস্মিক ঝড়ের ঘটনা বেড়েছে, যা তাদের জীবনে নতুন করে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তারা বলেন, আগাম সতর্কবার্তা বা আশ্রয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এমন ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো যেত।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “ঝড়টা এত দ্রুত এসেছিল যে কিছু বোঝার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা শুধু শব্দ শুনেছি, আর দেখেছি ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ছে।”
এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে কত দ্রুত সেই সহায়তা পৌঁছাবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়েছে।
নাছিমা খাতুনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং পুরো এলাকার জন্য এক শোকাবহ স্মৃতি হয়ে থাকবে। তার দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা, আর স্বামী হাবিবুর রহমানের জন্য এটি এক অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই নির্মমতা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত। একই সঙ্গে এটি আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে—দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা কতটা প্রস্তুত?
সব মিলিয়ে, সিরাজগঞ্জের এই ঝড় শুধু গাছপালা বা ঘরবাড়ি ধ্বংস করেনি, এটি ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, কেড়ে নিয়েছে একটি জীবন এবং রেখে গেছে অসংখ্য মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ও শোক।