প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও উত্তেজনার আগুন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন শহরে নতুন করে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। একই সময়ে গাজা উপত্যকায়ও ধারাবাহিক হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। পাল্টা জবাবে ইসরাইলি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে হিজবুল্লাহ। ক্রমবর্ধমান এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অনিশ্চয়তা ও মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর একাধিক বিমান হামলায় অন্তত চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩৩ জন। হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল বৈরুতের হারত হরিক ও সাকসাকিয়ে এলাকা। বিস্ফোরণের পর ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আতঙ্কে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে দেখা যায় সাধারণ মানুষকে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu দাবি করেছেন, এই অভিযানে হিজবুল্লাহর বিশেষ ইউনিট ‘রাদওয়ান ফোর্স’-এর এক কমান্ডারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তেল আবিবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই কমান্ডার সীমান্ত এলাকায় ইসরাইলবিরোধী সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। যদিও হিজবুল্লাহ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় হামলার পর নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তথাকথিত নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে। বৈরুতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের ইয়োহমোর আল-শাকিক এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী ফসফরাস শেল ব্যবহার করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহুবার সতর্ক করেছে যে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহার মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই ধরনের অস্ত্র মানুষের শরীরে ভয়াবহ দগ্ধতা সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলার পর প্রতিরোধ আরও জোরদার করেছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি দাবি করেছে, হুলা শহরে ইসরাইলি সামরিক সরঞ্জাম ও একটি বুলডোজার ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত ইসরাইলি সেনা ও সামরিক যান লক্ষ্য করে নিয়মিত রকেট হামলা চালানো হচ্ছে। হিজবুল্লাহ বলছে, নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা এবং ইসরাইলি হামলার জবাব দিতেই তারা এই পাল্টা আক্রমণ পরিচালনা করছে।
লেবানন-ইসরাইল সীমান্তে চলমান সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়ে উঠছেন সাধারণ মানুষ। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো থেকে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে আহতদের চাপ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিদিনের বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের কারণে স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
এদিকে কূটনৈতিক অচলাবস্থার জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র বলেছেন, ওয়াশিংটন একটি ফলপ্রসূ আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে, কিন্তু হিজবুল্লাহর ধারাবাহিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইসরাইলের অভ্যন্তরে হামলা এবং সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে সংগঠনটি।
তবে হিজবুল্লাহ ও তাদের সমর্থকরা বলছেন, ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলা ও দখলদার নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
অন্যদিকে গাজা উপত্যকায়ও রক্তপাত থামছে না। খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি চলন্ত গাড়িকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি বাহিনী হামলা চালালে হামাস পরিচালিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৭ জন। হামলার পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসস্তূপ ও আতঙ্ক। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে আহতদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
গাজা সিটিতেও পৃথক হামলার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে হামাসের এক নেতার ছেলে গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। হামাস এই ধারাবাহিক হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘গণহত্যামূলক’ অভিযান চালাচ্ছে ইসরাইল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা তেল আবিবকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
হামাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে ইসরাইল বারবার হামলা চালানোর সুযোগ পাচ্ছে। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং হামলা বন্ধে জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে সংগঠনটি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু লেবানন বা গাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির অবস্থানও সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের ভয়াবহতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। শিশু, নারী ও বয়স্কদের মধ্যে আতঙ্ক চরমে পৌঁছেছে। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবিক সংকটে পড়েছে। প্রতিদিন বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা, আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।