নবম পে-স্কেলে বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬
  • ২ বার
নবম পে-স্কেলে বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বেতন কমিশনের সুপারিশ। প্রস্তাবিত এই কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এই প্রস্তাব নিয়ে এখন চলছে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং জনসেবার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মজীবীদের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় এনে নতুন পে-স্কেলের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সাবেক অর্থ সচিব Jakir Ahmed Khan–এর নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন একটি বিস্তৃত সুপারিশমালা তৈরি করে।

গত ২১ জানুয়ারি কমিশন তাদের প্রতিবেদন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা Muhammad Yunus–এর কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, কাঠামোগত পরিবর্তন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করা হয়। সরকারের প্রেস উইং তখন জানায়, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত আরও প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বেতন পুনর্গঠনের উদ্যোগগুলোর একটি হতে পারে। কারণ শুধু বেতন বাড়ানোই নয়, নতুন কাঠামোর মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে বেতন বৈষম্য কমানো এবং নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টাও করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন বর্তমানে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান আগের তুলনায় কমে আসবে। বর্তমানে এই অনুপাত যেখানে প্রায় ১:৯ দশমিক ৪, সেখানে নতুন কাঠামোয় তা ১:৮ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে বেতন কাঠামোয় একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে উচ্চ ও নিম্ন পর্যায়ের বেতনের ব্যবধান অতিরিক্ত না হয়।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। যদিও গ্রেড সংখ্যা আগের মতোই ২০টি রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে চাকরিজীবীদের পদমর্যাদা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও আর্থিক সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

এদিকে বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও আলাদা বেতন কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। এই তিনটি প্রতিবেদনের সুপারিশ বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করতে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটিটি ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে বলে জানা গেছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, দেশের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় একসঙ্গে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। তাই তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে সরকারি ব্যয়ের চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন পে-স্কেলে উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য বিদ্যমান ২০ ধাপের বাইরে আলাদা ধাপ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে পরে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে জানা গেছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের খবরকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিদ্যমান বেতন দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ বাড়তে থাকায় বেতন বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা এবং সেবার মান বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু বেতন বৃদ্ধি করলেই প্রশাসনিক কাঠামোর উন্নতি হবে না; একই সঙ্গে জবাবদিহি ও দক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা হয়নি। এ সময়ের মধ্যে দেশে মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, নবম পে-স্কেল শুধু সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা বাড়াবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে বাজারে অর্থের প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে। তবে একই সঙ্গে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চোখ এখন সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। প্রস্তাবিত এই পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে লাখো পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত