চোরাই মসলার ঢলে কোরবানির আগে বাজারে দামের ধস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬
  • ২ বার
চোরাই মসলার ঢলে কোরবানির আগে বাজারে দামের ধস

প্রকাশ: ০৭ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের মসলা বাজারে এক অদ্ভুত ও অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাধারণত এ সময় মসলার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। তবে চলতি বছর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈধ পথে আমদানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে বিপুল পরিমাণ মসলা দেশে প্রবেশ করায় পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই দামে উল্লেখযোগ্য ধস নেমেছে। এতে একদিকে যেমন ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন, অন্যদিকে আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা পড়েছেন মারাত্মক আর্থিক চাপে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মসলা আমদানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। অথচ বাজারে সরবরাহ কমার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘটছে তার বিপরীত চিত্র। সীমান্ত পথে অনিয়ন্ত্রিতভাবে আসা মসলা বৈধ আমদানির বাজারকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে। এর ফলে এলসি নির্ভর ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে সরেজমিনে দেখা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের মসলার দাম কমেছে। বিশেষ করে এলাচ, লবঙ্গ, জিরা ও গোলমরিচের মতো উচ্চমূল্যের মসলাগুলোর দামে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ১০০ টাকায়, যা চলতি সপ্তাহে নেমে এসেছে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ টাকায়। লবঙ্গের দামও একইভাবে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকায়। জিরা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫৩০ টাকায় এবং গোলমরিচের দাম নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ১০ টাকায়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দামের এই পতন স্বাভাবিক নয়। আমদানির তুলনায় বাজারে পণ্যের সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসা মসলা বাজারে ঢুকে পড়ায় বৈধ আমদানিকারকদের পণ্যের দাম সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম পাইকারি মসলা ব্যবসায়ী সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট অমর কান্তি দাশ জানান, ব্যবসায়ীরা বর্তমানে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তার ভাষায়, ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এলসি খোলার সক্ষমতা অনেক ব্যবসায়ীরই কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশীয় বাজারে দাম কমে যাওয়ায় অনেকেই লোকসানে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিরা, লবঙ্গ, এলাচ ও জয়ফলের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর মধ্যে জিরা আমদানি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৯৩ মেট্রিক টন, লবঙ্গ ১ হাজার ২৫৭ মেট্রিক টন, এলাচ ১ হাজার ৯৮ মেট্রিক টন এবং জয়ফল ৩৪৬ মেট্রিক টন। যদিও এসব পণ্যের আমদানি কমেছে, তবে দারুচিনি, গোলমরিচ ও জয়ত্রীর আমদানিতে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানিয়েছেন, আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় বাজারে কোনো ধরনের বড় সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তিনি বলেন, শুধু চট্টগ্রাম বন্দর নয়, দেশের অন্যান্য স্থলবন্দর দিয়েও নিয়মিতভাবে মসলা আমদানি হচ্ছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সীমান্ত পথে অবৈধ মসলা প্রবেশ বন্ধ না হলে বৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। খাতুনগঞ্জের মেসার্স আইমন এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব দামে পণ্য কেনা হয়, সেই দামে বিক্রি করা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারণ বাজারে অবৈধভাবে আসা পণ্যের দাম অনেক কম, যা পুরো বাজার কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে।

একই এলাকার আরেক ব্যবসায়ী নূরুল আজিম মুন্না বলেন, বাজারে একদিকে বিক্রি কমে গেছে, অন্যদিকে প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বৈধ পথে পণ্য এলেও সীমান্ত দিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে মসলা ঢোকার কারণে পুরো বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মসলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এই ধরনের অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও আমদানি খাত উভয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কোরবানির ঈদের মতো বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে বাজারে যখন চাহিদা বাড়ার কথা, তখন দামের এই পতন অর্থনীতির জন্য এক ধরনের সংকেতও বহন করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে হলে বৈধ আমদানি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি বাড়ানো না গেলে এই ধরনের চোরাচালান প্রবণতা কমানো কঠিন হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোক্তারা আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা কম দামে মসলা কিনতে পারলেও এর পেছনে থাকা অস্থির বাজার কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোরবানির ঈদের আগে এমন পরিস্থিতি বাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে একদিকে স্বস্তি, অন্যদিকে উদ্বেগ—দুটিই সমানভাবে বিরাজ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত