প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়ার ঐতিহাসিক বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে। আগামী ৯ মে উদযাপিত হতে যাওয়া রুশ ‘ভিক্টরি ডে’ উপলক্ষে ইউক্রেন নাশকতামূলক হামলা চালাতে পারে বলে অভিযোগ তুলেছে মস্কো। এমন আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে কিয়েভে বড় ধরনের পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ইউক্রেনের রাজধানীতে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের দ্রুত সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের আবহ তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র Maria Zakharova এক বিবৃতিতে বলেন, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইউক্রেন ‘উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড’ চালাতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছে মস্কো। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাশিয়ার জাতীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো প্রচেষ্টার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। যেকোনো ‘অপ্রীতিকর পরিস্থিতি’ এড়াতে কিয়েভে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের দ্রুত শহর ত্যাগ করার অনুরোধও জানান তিনি।
রাশিয়ায় ৯ মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় স্মরণে প্রতিবছর জাঁকজমকপূর্ণভাবে দিবসটি উদযাপন করা হয়। মস্কোর রেড স্কয়ারে সামরিক কুচকাওয়াজ, আধুনিক অস্ত্র প্রদর্শন এবং প্রেসিডেন্টের ভাষণের মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হয়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই দিবস ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। গত কয়েক বছরে ড্রোন হামলা ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিস্ফোরণের ঘটনায় রুশ কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজয় দিবস রাশিয়ার জন্য শুধু একটি জাতীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রতীক। তাই এই সময় কোনো ধরনের হামলা বা নাশকতার আশঙ্কাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ক্রেমলিন। রাশিয়ার ধারণা, ইউক্রেন বা ইউক্রেনপন্থী বাহিনী এই প্রতীকী মুহূর্তকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে মস্কোকে বিব্রত করা যায়।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রেও পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সুমিতে বুধবার রুশ বাহিনীর ড্রোন হামলায় একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, হামলায় কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। হামলার পর স্কুল ভবনের একটি বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান চালান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আতঙ্কিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ছুটোছুটি করতে দেখা গেছে।
সুমির স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ড্রোন হামলার তীব্রতা বেড়েছে। রাতভর সাইরেন বাজতে থাকায় মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক পরিবার তাদের শিশুদের নিয়ে শহর ছাড়ার কথাও ভাবছে। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে ভয়াবহ মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে বলে জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
শুধু সুমি নয়, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় পোকরভস্ক এলাকাতেও ব্যাপক হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর দাবি, একদিনেই ওই অঞ্চলে অর্ধশতাধিক আক্রমণ হয়েছে। গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা এবং স্থলযুদ্ধ মিলিয়ে পুরো অঞ্চলটি এখন কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু মানুষ মানবিক সংকটে পড়েছেন।
অন্যদিকে ইউক্রেনও পাল্টা প্রতিরোধ জোরদার করেছে। কিয়েভের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযানে বেশ কয়েকজন রুশ সেনা নিহত হয়েছেন। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা রুশ বাহিনীর ১২টি সেনাদল ও তিনটি আর্টিলারি সিস্টেম ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এসব দাবির স্বাধীন যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয়নি।
দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে গত একদিনে প্রায় ২০০ বার সরাসরি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে উভয় পক্ষই প্রতীকী ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার চেষ্টা করছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে হামলা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখলেও রাশিয়া এটিকে নিজেদের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। মস্কো বারবার অভিযোগ করে আসছে, পশ্চিমা সমর্থন যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছে। অন্যদিকে ইউক্রেন বলছে, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্যই তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, চলমান সংঘাত ইউরোপের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজয় দিবস ঘিরে রাশিয়ার কড়া অবস্থান এবং কূটনীতিকদের কিয়েভ ছাড়ার আহ্বান পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। যেকোনো ভুল পদক্ষেপ বা বড় ধরনের হামলা সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। ফলে আগামী কয়েকদিন শুধু ইউক্রেন নয়, পুরো বিশ্বই নজর রাখবে মস্কো ও কিয়েভের পরিস্থিতির দিকে।