দুই স্তরের ছিনতাই চক্রে আতঙ্কে রাজধানী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
রাজধানীর আদাবরে নতুন কৌশল নিয়েছে ছিনতাইকারীরা।

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকার আদাবর এলাকায় ছিনতাইকারীদের অভিনব ও সংগঠিত কৌশল নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের অভিযোগ, এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে অপরাধ পরিচালনা করছে। একদল প্রথমে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেয়, পরে অন্য একটি দল ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার বিনিময়ে মালামাল ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আদাবরের মনসুরাবাদ এলাকায় সম্প্রতি এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ দিনের বেলাতেই ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনায় এক ফুচকা বিক্রেতা বাসায় ফেরার পথে তিন ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, তাকে একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে নিয়ে গিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় এবং তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী ওই ফুচকা বিক্রেতা জানান, তার পরিবারের সদস্যরা কিস্তিতে টাকা জোগাড় করে মোবাইল ফোনটি কিনে দিয়েছিলেন। ছিনতাইয়ের পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ঘটনার কিছুক্ষণ পরই একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে তাকে ফোন করা হয় এবং জানানো হয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিলে তার মোবাইল ফোন ফিরিয়ে দেওয়া হবে। পরে দেখা যায়, একই চক্রের অন্য একটি অংশ এই প্রস্তাব দিয়েছে।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, এলাকার বিভিন্ন গলিতে ছিনতাইকারীরা ওত পেতে থাকে। অনেক সময় পথচারীদের লক্ষ্য করে তারা হামলা চালায় এবং দ্রুত পালিয়ে যায়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট করার জন্য আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট করে দেয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, মনসুরাবাদের একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘর দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে নেশাজাতীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে দাবি তাদের। দিন ও রাত নির্বিশেষে এই এলাকায় মানুষ চলাচলে ভয় পাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

একজন বাসিন্দা বলেন, “এই এলাকা এখন নিরাপদ নয়। দিনের আলোতেও মানুষ আতঙ্কে থাকে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে।”

এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সাম্প্রতিক ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত একটি চক্রের কয়েকজন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রের নেতৃত্বে ছিল ইউসুফ নামের একজন ব্যক্তি। তার নেতৃত্বেই সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাই এবং পরে টাকার বিনিময়ে মালামাল ফেরত দেওয়ার কাজ চলছিল।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার জানান, ঘটনার পরপরই অভিযান চালিয়ে মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলে অপরাধ করে আসছে। তারা প্রথমে ছিনতাই করে, পরে ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে মালামাল ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

তিনি আরও জানান, এই চক্রের পেছনে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এলাকায় ঘটে যাওয়া অন্যান্য ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই চক্রের সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং চক্রের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইয়ের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে শুধু ছিনতাই করে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল, এখন সেখানে সংগঠিতভাবে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কৌশল যুক্ত হয়েছে। এটি অপরাধ জগতের নতুন প্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের অপরাধ দমন করতে শুধু অভিযান নয়, প্রযুক্তিগত নজরদারি ও স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিত্যক্ত ভবন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।

স্থানীয়রা প্রশাসনের প্রতি দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তার নয়, পুরো চক্রকে ভেঙে দিতে হবে, নাহলে এই ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর আদাবর এলাকার এই ছিনতাই চক্র নতুন ধরনের অপরাধ কৌশল ব্যবহার করে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলমান থাকলেও স্থানীয়রা এখন নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন তারা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত