প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বড় ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে কেন্দ্র করে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৮০৯ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন কাঠামোকে আরও আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করা হচ্ছে।
বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বেশ কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৩টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫৭২ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে, যা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া দেশে মোট ১ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৬টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বর্তমানে নির্মাণাধীন রয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রকল্প সরাসরি সরকারি উদ্যোগে বাস্তবায়িত হচ্ছে, আবার অনেক প্রকল্প বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে এগিয়ে চলছে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশের গ্রিডভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে। শিল্প খাতের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং অফ-গ্রিড নবায়নযোগ্য উৎস যুক্ত করলে এই সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছায়।
তবে বাস্তব উৎপাদন চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার ৭৫৫ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে, যেখানে গত বছর একই সময়ে উৎপাদন ছিল অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে এই পার্থক্য মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে দেশে মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াটের বেশি। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত রয়েছে ১ হাজার ৭৩ মেগাওয়াট এবং অফ-গ্রিড ব্যবস্থায় রয়েছে ৩৭৭ মেগাওয়াটের বেশি। এছাড়া জলবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও বায়োমাস থেকেও সামান্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭৪৩ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এর মধ্যে সৌর হোম সিস্টেম, ছাদভিত্তিক সৌর ব্যবস্থা এবং সৌর পার্ক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নতুন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে জামালপুরের মাদারগঞ্জে নির্মাণাধীন ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাত থেকেও নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে আরও শতাধিক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে রাজধানীতে বিদ্যুতের চাপ কমাতে প্রতিটি বাসায় সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য করা হবে এবং এর জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। আগামী জুনের মধ্যেই এ বিষয়ে সরকারি আদেশ জারি হতে পারে বলে জানা গেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে এটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা।
সব মিলিয়ে, সৌরবিদ্যুৎকে কেন্দ্র করে সরকারের এই বড় পরিকল্পনা দেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে এই উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা নির্ধারণ করবে দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ভবিষ্যৎ।