প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝালকাঠি শহরে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর পরিত্যক্ত বাসভবনে আবারও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার বিকেলে শহরের রোনালসে সড়কে অবস্থিত তিনতলা এই ভবনকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভবনটির প্রধান ফটক দীর্ঘদিন ধরে টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিল। বুধবার দুপুরে একদল শিক্ষার্থী, যারা নিজেদের জুলাই ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দেন, প্রথমে সেই টিনের বেড়া অপসারণ করেন। এরপর তারা ড্রিল কাটার মেশিন ব্যবহার করে ভবনের প্রধান ফটক কেটে উন্মুক্ত করে দেন। এতে ভবনটি পুরোপুরি খোলা অবস্থায় চলে আসে।
এই ঘটনার পর এলাকাজুড়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশ জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় ভবনটিতে প্রথম হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেই সময় আগুনে ভবনটির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।
পরবর্তীতে আবারও একই বছরের আগস্ট মাসে ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ভাঙচুরের ঘটনার পর ঝালকাঠিতেও এই ভবন লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা হয়। তখন ভবনের গেট ও দেয়ালের অংশ ভেঙে ফেলা হয় বলে স্থানীয়রা জানান। এরপর থেকে ভবনটি কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা এই ভবন নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগও রয়েছে। বাসিন্দাদের দাবি, ভবনটি অরক্ষিত থাকায় সেখানে ময়লা-আবর্জনা জমে এবং রাতের বেলায় সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায়। এতে এলাকার পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
সম্প্রতি কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি ভবনটির প্রধান ফটকে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়। এর পরপরই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতা-কর্মী সেখানে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, এই ভবনকে ঘিরে রাখার মাধ্যমে একটি “অতীত রাজনৈতিক প্রতীক” আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীরা প্রথমে টিনের বেড়া খুলে ফেলে। পরে ড্রিল মেশিন ব্যবহার করে প্রধান গেট সম্পূর্ণভাবে কেটে দেওয়া হয়। এতে ভবনটি আবারও খোলা অবস্থায় চলে আসে এবং সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক আন্দোলনকর্মী মো. লিখন বলেন, “যে কাঠামো ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত, সেটিকে সংরক্ষণ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।” তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এই জায়গা বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যবহার হতে পারে, এমনকি এটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দেওয়ার পক্ষেও তারা মত দিয়েছেন।
ঝালকাঠি জেলা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ইয়াসিন ফৈরদৌস ইফতি বলেন, এই ভবনকে তারা অতীত রাজনৈতিক শাসনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি আবার তৈরি না হয়, সে জন্য এটি উন্মুক্ত রাখা উচিত এবং কোনো সংস্কার বা সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত নয়।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় আহ্বায়ক আল তৌফিক লিখন দাবি করেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিনই ভবনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সময় জনরোষের মুখে ভবনটিতে আগুন লাগানো হয় এবং পরবর্তীতে এটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, ভবনটি সংরক্ষণের চেষ্টা করা হলে তারা তা প্রতিহত করবেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের দিকেও প্রশ্ন উঠেছে। ঝালকাঠি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তারা অবগত হয়েছেন এবং ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক রাজনৈতিক নেতার বাড়ি ও স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তারই ধারাবাহিকতায় ঝালকাঠির এই ভবনটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সময় ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও ভবনের বড় অংশ পুড়ে যায়।
পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভবন থেকে কিছু লাগেজ উদ্ধার করে, যার মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায় বলে তৎকালীন সময়ে জানানো হয়। তবে এরপর থেকেই ভবনটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে এবং কোনো ধরনের সংস্কার হয়নি।
বর্তমান ঘটনার পর ভবনটি আবারও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের মধ্যে একদিকে যেমন রাজনৈতিক উত্তেজনা রয়েছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে ঝালকাঠির এই পরিত্যক্ত ভবনকে ঘিরে নতুন করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা স্থানীয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বিষয়টি আরও বিস্তৃত রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।