লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন আরও ১৭৪ বাংলাদেশি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
লিবিয়া ফেরত বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লিবিয়ায় আটকে পড়া আরও ১৭৪ বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, নির্যাতন ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে সময় কাটানোর পর বৃহস্পতিবার ভোরে তারা দেশে পৌঁছান। বাংলাদেশ সরকার, লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার যৌথ সহযোগিতায় তাদের এই প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বিশেষ ব্যবস্থায় পরিচালিত একটি ফ্লাইটে করে ভোরের দিকে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান তাদের স্বাগত জানান।

ফেরত আসা বাংলাদেশিদের অধিকাংশই মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে এবং ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দালালচক্র তাদের বিপজ্জনক সমুদ্রপথে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর অনেকেই ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হন।

ফেরত আসাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের অনেককে জিম্মি করে রাখা হয়। কেউ কেউ শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ এবং অমানবিক আচরণের শিকার হন। দীর্ঘদিন আটক অবস্থায় থেকে তারা চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন।

সরকারি কর্মকর্তারা জানান, এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম ছিল একটি সমন্বিত উদ্যোগের অংশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা একযোগে কাজ করেছে। এতে লিবিয়া সরকারের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা পাওয়া গেছে।

প্রত্যাবাসনের পর বিমানবন্দরে তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার পক্ষ থেকে প্রত্যেককে যাতায়াত খরচ, খাবার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনে অস্থায়ী আবাসনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অনেকে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ শেষে দেশে ফিরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

একজন ফেরত আসা বাংলাদেশি জানান, তিনি বিদেশে গিয়ে ভালো আয়ের আশায় বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনো কল্পনাও করেননি। তিনি বলেন, দালালদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে জীবন বিপন্ন হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসাটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, যাতে মানুষ দালালচক্রের প্রতারণার শিকার না হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে ফেরত আসা ব্যক্তিদের নিজেদের অভিজ্ঞতা অন্যদের সামনে তুলে ধরতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষ সহজেই এই বিপদের ভয়াবহতা বুঝতে পারে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, লিবিয়ার বিভিন্ন আটককেন্দ্রে এখনো অনেক বাংলাদেশি অবস্থান করছেন। তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক ও মানবিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে আরও বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব এবং বিদেশে উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা অনেক তরুণকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে মানবপাচারকারী চক্র। তারা মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে মানুষকে বিপজ্জনক যাত্রায় পাঠায়, যেখানে অনেকেই মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েন।

লিবিয়া দীর্ঘদিন ধরেই মানবপাচার এবং অবৈধ অভিবাসনের একটি বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষ ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় সেখানে গিয়ে আটকে পড়েন। অনেকেই নির্যাতনের শিকার হন এবং মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে লিবিয়া থেকে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। গত কয়েক বছরেও একাধিক দফায় শত শত বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে নতুন করে মানুষ যেন অবৈধ পথে বিদেশে না যায়, সে বিষয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, লিবিয়া থেকে আরও ১৭৪ বাংলাদেশির দেশে ফেরা একদিকে যেমন স্বস্তির খবর, অন্যদিকে এটি অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের ভয়াবহ বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করলেই এই সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত