প্রকাশ: ৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত, সীমান্ত উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার আবহের মধ্যেই নতুন করে শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইসরাইল ও লেবানন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আগামী ১৪ ও ১৫ মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কূটনৈতিক আগ্রহ। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল পুনর্গঠন—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই মূলত আলোচনার টেবিলে মুখোমুখি হবেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বৈরিতাপূর্ণ সম্পর্কের কারণে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি সংলাপ খুবই বিরল ঘটনা। সেই দিক থেকে আসন্ন বৈঠককে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে চলমান সংঘাতের মধ্যে যখন প্রতিদিনই নতুন করে প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর আসছে, তখন শান্তি আলোচনার উদ্যোগ অঞ্চলটির সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে।
মার্কিন মধ্যস্থতায় সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির একটি কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দক্ষিণ লেবাননে সংঘাত থামেনি। বরং গত কয়েক সপ্তাহে সেখানে নতুন করে তীব্র হয়েছে ইসরাইলি বিমান ও ড্রোন হামলা। বৃহস্পতিবারও দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক শহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে লেবাননের স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সূত্র। এসব হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু বসতবাড়ি, দোকানপাট এবং ধর্মীয় স্থাপনা। কয়েকটি এলাকায় সাধারণ মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
লেবাননের সরকারি তথ্যমতে, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া নতুন দফার সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৭২৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ৮ হাজার মানুষ। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ক্রমাগত হামলা ও গোলাবর্ষণের কারণে দক্ষিণ লেবাননের বহু পরিবার এখন বাস্তুচ্যুত জীবন কাটাচ্ছে। অনেকেই সীমান্তবর্তী এলাকা ছেড়ে রাজধানী বৈরুত বা অন্যান্য নিরাপদ অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সেখানে বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে ইসরাইল দাবি করেছে, সীমান্ত এলাকায় হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযানে গত এক সপ্তাহে অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। একইসঙ্গে সংগঠনটির দুই শতাধিক স্থাপনা ধ্বংস করার কথাও জানিয়েছে তেল আবিব। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তর সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে হিজবুল্লাহও দাবি করেছে, তারা ইসরাইলি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে একাধিক রকেট ও গোলাবর্ষণ চালিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। ফলে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও বাস্তব পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের সামরিক উত্তেজনা এখনও কমেনি।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সম্প্রতি হিজবুল্লাহর রাদওয়ান ফোর্সের এক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ার পর দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যারা ইসরাইলকে হুমকি দেবে তাদের কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। শত্রুরা যত গভীর বা সুরক্ষিত স্থানে লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাদের খুঁজে বের করা হবে। নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের আসন্ন বৈঠক সফল হলে তা শুধু ইসরাইল-লেবানন সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ বর্তমান সংঘাত শুধু দুই দেশের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনীতিতেও। বিশেষ করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এই সংঘাতকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মহল মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার বিকল্প খুব সীমিত। কারণ সামরিক সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বাড়বে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা। সে কারণেই মার্কিন প্রশাসন এবার আলোচনাকে বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকে নিতে চায়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় লেবানন থেকে ইসরাইলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে উপস্থাপন করবে বৈরুত। একইসঙ্গে বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। অন্যদিকে ইসরাইল সীমান্ত নিরাপত্তা ও হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম সীমিত করার বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় এই ধরনের বৈঠক সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়। অতীতেও মার্কিন মধ্যস্থতায় কয়েক দফা আলোচনা হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান আসেনি। তবে বর্তমান সংঘাতের ব্যাপকতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে এবার আলোচনায় কিছু বাস্তব অগ্রগতি হতে পারে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ ও সংঘাতের দীর্ঘ ছায়া সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে সাধারণ মানুষের জীবনে। সীমান্তবর্তী এলাকার পরিবারগুলো প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ওয়াশিংটনের বৈঠক শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং লাখো মানুষের ভবিষ্যৎও অনেকাংশে এর ওপর নির্ভর করছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এই বৈঠক। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছে, চলমান উত্তেজনা আরেকটি বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তাতেও পড়বে।
এমন বাস্তবতায় আগামী সপ্তাহের ওয়াশিংটন বৈঠককে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবেই দেখছেন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা। আলোচনার মাধ্যমে যদি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং মানবিক সহায়তার কার্যকর রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব হয়, তবে তা দীর্ঘ সংঘাতে ক্লান্ত সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা হয়ে উঠতে পারে।