সাতক্ষীরার আম দখল করছে বাজারে নতুন স্থান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬
  • ১ বার
সাতক্ষীরার আম বাজারে নতুন অর্থনৈতিক উত্থান

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা এখন দেশের আম বাজারে নতুন শক্তি হিসেবে দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে। একসময় যেখানকার পরিচিতি ছিল সুন্দরবন, চিংড়ি ঘের ও লবণাক্ত জমির কৃষি, সেই সাতক্ষীরা এখন আম উৎপাদন ও বিপণনে তৈরি করছে এক নতুন অর্থনৈতিক পরিচয়। মৌসুমের শুরুতেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আগে বাজারে আসা এই জেলার আম এখন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

চলতি মৌসুমে জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হওয়ার আগেই সাতক্ষীরার আম বাজারে আসতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ জাতের আম সংগ্রহের মাধ্যমে মৌসুম শুরু হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে হিমসাগর, ল্যাংড়া এবং পরবর্তীতে আম্রপালি জাতের আম বাজারে আসবে। মৌসুম শুরুর এই আগাম প্রবণতা সাতক্ষীরার আমকে দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় আলাদা অবস্থানে নিয়ে গেছে।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, এবারের মৌসুমে আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে অনুকূলে থাকলেও মাঝে মাঝে পোকার আক্রমণ এবং কিছু ঝড়ের কারণে ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে সার্বিকভাবে ফলন ভালো হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। কলারোয়া এলাকার আম চাষি খান নাজমুস সাদাত জানান, মৌসুমের শুরুতেই প্রতি মণ গোবিন্দভোগ আম ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য বেশ লাভজনক।

সাতক্ষীরার আমের বাজার সম্প্রসারণ শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রায় ৭০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তত ১০০ টন আম বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে সাতক্ষীরার আম ইতোমধ্যেই চেইন শপে জায়গা করে নিচ্ছে, যা জেলার কৃষি অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাতক্ষীরার আম বাজারে আগেভাগে আসার পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বিশেষ কারণ। আঞ্চলিক উদ্যান তত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জানান, অক্ষাংশের তারতম্যের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের আম উত্তরাঞ্চলের তুলনায় আগে পরিপক্ব হয়। তার মতে, প্রতি ডিগ্রি অক্ষাংশ বৃদ্ধির সঙ্গে আম সংগ্রহকাল কয়েক দিন করে পিছিয়ে যায়, ফলে সাতক্ষীরার আম রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের তুলনায় প্রায় এক থেকে দুই সপ্তাহ আগেই বাজারে আসে।

তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের উচ্চ তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা আমের মুকুল দ্রুত ফোটাতে সাহায্য করে, যার ফলে ফলও দ্রুত পরিপক্ব হয়। একই সঙ্গে লবণাক্ত মাটি এই অঞ্চলের কৃষিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কৃষি গবেষকদের মতে, লবণাক্ত মাটিতে গাছের বৃদ্ধি ও পরিপক্বতার প্রক্রিয়া কিছুটা ত্বরান্বিত হয়, যার প্রভাব আমের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, লবণাক্ততার কারণে শুধু আম নয়, অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও পরিপক্বতার সময় কিছুটা কমে আসে। তবে এটি স্বাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না বরং অনেক ক্ষেত্রে মিষ্টতা আরও বাড়িয়ে দেয় বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, সাতক্ষীরার হিমসাগর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাত একই জাত হলেও মাটির গুণাগুণ ও তাপমাত্রার কারণে স্বাদে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।

ক্রেতাদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্ন থাকে, মৌসুমের শুরুতেই আসা এই আম আদৌ স্বাদে ও গুণে সঠিক কিনা। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাতক্ষীরার আম প্রাকৃতিকভাবেই আগাম পরিপক্ব হয়, ফলে এতে কৃত্রিমভাবে পাকানোর প্রয়োজন পড়ে না। তারা জানান, একই জাতের আমের স্বাদে বড় ধরনের পার্থক্য নেই, বরং আবহাওয়া ও মাটির আর্দ্রতা কিছুটা পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

এদিকে কৃষি বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সাতক্ষীরার আমকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি এবং নিরাপদ চাষাবাদের কারণে এখানকার আম এখন বিষমুক্ত হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে এই আমের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সাতক্ষীরার অনেক কৃষক এখন লবণাক্ত জমির বিকল্প হিসেবে আম বাগানকে লাভজনক খাত হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। কৃষি জমির ব্যবহার বদলে এখন হাজার হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান গড়ে উঠছে, যা জেলার অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

চলতি মৌসুমে প্রায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১২ হাজার ৩০০ চাষি আম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি অফিস। এই বিপুল সংখ্যক কৃষক ও উৎপাদন ব্যবস্থা সাতক্ষীরাকে দেশের আম উৎপাদন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাতক্ষীরার আম এখন শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, বরং এটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হচ্ছে। সময়মতো বাজারে আসা, তুলনামূলক ভালো স্বাদ এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানির সুযোগ এই খাতকে আরও শক্তিশালী করছে।

তবে তারা সতর্ক করেছেন, বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ চাষাবাদ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা জরুরি। নাহলে দীর্ঘমেয়াদে এই সম্ভাবনাময় খাত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার আম এখন দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী আম বাজারের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের এই নতুন উত্থান দেশের আম শিল্পে এক নতুন প্রতিযোগিতা ও সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত