প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা এখন পরিণত হয়েছে কোরবানির পশুর এক বড় সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে। উপজেলার প্রতিটি গ্রামে ও খামারে চলছে পশু প্রস্তুতির ব্যস্ত সময়। কোথাও গরুকে গোসল করানো হচ্ছে, কোথাও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও ক্রেতাদের সঙ্গে চলছে দরদাম ও বিক্রির আলোচনা। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে স্থানীয় পশুর হাট ও খামারগুলো।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার শিবচরে মোট ৬৬৫টি ছোট-বড় খামারে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে প্রায় ২১ হাজার ২০০টি পশু। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৯৮০টি গরু, কয়েকটি মহিষ এবং প্রায় ১০ হাজার ২৩০টি ছাগল ও ভেড়া। স্থানীয়ভাবে কোরবানির পশুর চাহিদা যেখানে প্রায় ১৯ হাজার, সেখানে উৎপাদন রয়েছে চাহিদার চেয়ে বেশি। ফলে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে প্রায় ২ হাজারের মতো পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হতে পারে।
শিবচরের কাদিরপুর ইউনিয়নের ‘নাইম খান এগ্রো ফার্ম’ এখন এই অঞ্চলের অন্যতম বড় খামার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি পশুর জন্য আলাদা যত্ন নেওয়া হচ্ছে। খামারে বর্তমানে প্রায় ১৬০টি গরু, ৪টি মহিষ, ২৩০টি ছাগল এবং কিছু ভেড়া রয়েছে। প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পশুগুলোকে কাঁচা ঘাস, ভুষি ও পুষ্টিকর খাদ্য দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষাও নিয়মিত করা হচ্ছে।
খামারের মালিক মশিউর রহমান মজিবর খান জানান, মাত্র ৩০টি গরু নিয়ে শুরু করা এই খামার এখন উপজেলার অন্যতম বড় খামারে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক উপায়ে পশু পালন করায় পশুর গুণগত মান ভালো থাকে। তবে এবার পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে। তবুও তিনি আশা করছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে ভালো দাম পাওয়া যাবে।
স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা ইতোমধ্যে শিবচরের খামারগুলোতে আসতে শুরু করেছেন। তারা পশু দেখে দরদাম করছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি খামার থেকেই পশু কিনে নিচ্ছেন। আবার অনেক পশু স্থানীয় হাটে নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে। খামারিরা জানান, এবার ক্রেতাদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে ভালো, যা তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
শুধু বড় খামার নয়, উপজেলার ছোট ও মাঝারি খামারিরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন। বছরজুড়ে পরিশ্রম করে লালন-পালন করা পশুগুলো এখন বিক্রির অপেক্ষায়। তবে পশুখাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক খামারি কিছুটা অর্থনৈতিক চাপে রয়েছেন। তারপরও ঈদকে কেন্দ্র করে তারা লাভের আশায় দিন গুনছেন।
লিওন এগ্রো ফার্মের মালিক লিওন ঢালি বলেন, বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে স্থানীয় খামারিরা ভালো লাভের মুখ দেখবে। তিনি মনে করেন, অবৈধভাবে পশু আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে স্থানীয় খামারগুলো আরও শক্তিশালী হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হরিশ চন্দ্র বোষ জানান, শিবচরে কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে। ভেটেরিনারি সার্জন ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা খামারিদের পশু সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অবৈধভাবে বাইরের দেশ থেকে পশু প্রবেশ না করলে স্থানীয় খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন।
এদিকে কোরবানির পশুর হাটগুলোকে কেন্দ্র করে শিবচরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। মাদবরেরচর হাটসহ বিভিন্ন হাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। জাল টাকা শনাক্তকরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সহযোগিতায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, ঈদুল আজহা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সুযোগ। পশু বিক্রির মাধ্যমে কৃষক ও খামারিরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পান। শিবচরের খামারগুলোতে সেই সম্ভাবনাই এবার সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
সব মিলিয়ে শিবচর এখন কোরবানির পশুর এক গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজারে আগাম প্রস্তুতি এবং ক্রেতাদের উপস্থিতি মিলিয়ে পুরো এলাকায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। খামারিদের চোখে-মুখে এখন একটাই স্বপ্ন—বছরের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়া এবং আগামীর জন্য আরও বড় পরিসরে পশু পালনের সুযোগ তৈরি করা।