গণমাধ্যমে নজিরবিহীন হামলার অভিযোগ টিআইবির

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের সময়কালে বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজিরবিহীন হামলা ও চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এই সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করছে।

শুক্রবার (৮ মে) রাজধানীর রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত দুদিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন। দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, গবেষক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সম্মেলনে গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পরবর্তী সময়ে দেশের গণমাধ্যমের ওপর যেসব হামলা ও আক্রমণ হয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পিত ও প্রকাশ্য ছিল। বিশেষ করে দুটি প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর যে ধরনের আক্রমণ চালানো হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানিক নয়, বরং সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যম ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

তিনি আরও বলেন, এই সময়ের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি সেনাসদস্যদের উপস্থিতি থাকা অবস্থাতেও কিছু হামলা প্রতিরোধ করা যায়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।

টিআইবি নির্বাহী পরিচালক অভিযোগ করেন, কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনায় সমাজের একটি অংশের প্রতিক্রিয়া ছিল উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এসব ঘটনার পর আনন্দ বা সন্তোষ প্রকাশ করেছে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তার মতে, গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যমান সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন।

গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ফিলিস্তিন, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকদের মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে ২৬ জন গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার মতে, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু শারীরিক নিরাপত্তাই নয়, মানসিক চাপ, হয়রানি এবং বিভিন্ন ধরনের বাধার মুখে সাংবাদিকরা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলস উইক, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া ডিয়াজ স্ট্রাক এবং এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান।

সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। মোট ১২টির বেশি সেশনে ২০ জন দেশি-বিদেশি আলোচক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করবেন।

সম্মেলনের অংশ হিসেবে ৬১ জন সাংবাদিক ফেলোশিপ অর্জন করেছেন, যারা তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও নতুন ধারণা উপস্থাপন করবেন। আয়োজকরা মনে করছেন, এই ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জপূর্ণ, অন্যদিকে তেমনি সম্ভাবনাময়। প্রযুক্তির বিকাশ ও তথ্যপ্রবাহের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে স্থায়ী সমাধান না এলে এই খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সম্মেলনের বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, গণমাধ্যমের ওপর আস্থা পুনর্গঠন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ বজায় রাখার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে এই সম্মেলন শুধু একটি আলোচনা সভা নয়, বরং বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত